Saturday, 24 April 2021

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

 

মুক্তগদ্য 


'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম 

মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল ,

মোরা বিধাতার মত নির্ভয় 

মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।'


- কবি কাজী নজরুল ইসলাম 


বড্ড   ছোট  বেলাটা মনে পরে আজ এই অতিমারীর  দিন'এ ।আর যতোই মনে পরে ততই মনে মনে তুলনা করে ফেলছি 2020/2021 র হতোভাগ্য বাচ্চা গুলোর  সাথে । এই COVID যদি  সব চেয়ে বেশি কারুর ক্ষতি  করে থাকে তো  সে হলো  ছোটদের । এই  নিয়ে  দ্বিতীয় বছর  হলো ছোট ছোট বাচ্চাদের স্কুল'এর দরজা বন্ধ ।

কোনো উপায়ে  নেই  যে  খুলবে  ।করোনা  তার থাবা দ্বিতীয় বারের জন্য আবার প্রসারিত করে ফেলেছে ।তাই বাচ্চা গুলো আজ আবার ঘর বন্দি ।যে ভিডিও গেম খেলা আর  টিভি দেখা থেকে আগে বড়োরা বাচ্চাদের  দূর'এ রাখতে চাইতো , আজ ওদের দিন কাটানোর সব  চেয়ে বড় সঙ্গী সেগুলোই হয়ে উঠেছে ।সারাক্ষন অনলাইন ক্লাস করে  খুদেরা এমনিতেই হাঁপিয়ে  উঠেছে ।

কিন্ত তারপরেও তো সেই ঘরে বসে থাকা ।হোম কোয়ারেন্টাইন ব্যাপারটা যে কি সেটা বোঝা একটা ছোট শিশুর পক্ষে খুবই কঠিন |আর বাবা মার অতি ব্যস্ত জীবনে কতটুকুই বা সময় দেওয়া  সম্ভব ও'দের ।তাই অনেকেই অধৈর্য হয়ে উঠেছে । বড়োদের  সাথে সাথে বাচ্চাদের  মেন্টাল স্ট্রেস ভীষণ ভাবে বাড়ছে ।ওদের ওপর  রাগ করার জায়গা কিন্ত বড়োদের আর নেই ।বন্ধুদের সাথে খেলার  উপায় নেই ,স্কুল যাওয়া নেই , ক্রিকেট/ ফুটবল এর মতো  কোনো টিম গেম খেলার  উপায় নেই ।বলুন তো ওরা কোথায় যাবে আর কি করবে সারাটা দিন ! তাই পেরেন্টস কে ইন্ডোর গেমস খেলায় বা নাচে,গানে,গল্পে  ওদের সঙ্গ দিতে হবে | বিশেষত যারা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি আর ছেলে  বা মেয়েটির  দ্বিতীয় সঙ্গী নেই ।ইন্টারনেট ঘেঁটে বাচ্চাটি কি দেখছে সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি আর কারণটা নিশ্চই সবারই জানা ।সাইবার ক্রাইমও দিন দিনই বেড়েই চলেছে |তাই সন্তানকে আরো বেশি করে বুঝতে হবে এই কঠিন পরিস্থিতে ।ধৈর্য ধরে ওদের রাগ অভিমান শুনতে হবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও ।কোনো ভাবেই যাতে মেন্টালি কোনো বাচ্চা  ডিপ্রেশন এ না চলে যায় ,এটাই কাম্য ।স্বপ্ন দেখি খুব তাড়াতাড়ি আমরা এই অতিমারীকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়াই আর আবার  আগের মতো খুদেরা নিজেদের শৈশব উপভোগ করার সুযোগ টুকুনি পাক ।পৃথিবী আবার ছোটদের কোলাহল  আর নিষ্পাপ  হাসি'তে মুখরিত হয়ে উঠুক !


বিশাখা ব্যানার্জী পতি




Friday, 23 April 2021

উপন্যাস নয় ১ - আবির মুখোপাধ্যায়

 




মুক্তগদ্য


জীবনের এই যে এত বাঁকবদল, প্রতিটির মুখেই তো মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল, আশা করেছিলাম আপনি আমার এই দুঃস্বপ্নের দিনগুলি সরিয়ে ও সারিয়ে দিতে আসবেন, কোনো এক হঠাৎ রোববার! 

আমার সামান্য ঘরে মলিন ও ধূসর পর্দাগুলি সরিয়ে সূর্যের প্রথম আলো উপহার দেবেন বহু দীর্ঘ বিনিদ্র রাতের পর! 


রক্তচাপের দিনে, আপনি আসেননি। এসেছেন বলতে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, এসেছে বলতে আমার মনোচিকিৎসক বন্ধুটি! 


নিজের কাছে অস্বীকার করতে পারি না এই চন্দ্রভুক অমাবস্যার দীর্ঘ কালো রাত, বদ্ধ ঘরে ঘুরতে থাকা ভারী শীতল বাতাস আর ধূসর পর্দাগুলি আমায় বিব্রত করেছে, যথেচ্ছ! ভেতর ভেতর অজস্র সেতু ভেঙে পড়তে দেখে আমিও ভয় পেয়েছি কিঞ্চিত! 

একদিন উপলব্ধি করলাম, ভেঙে পড়তে চাওয়া মানুষের এক সহজ প্রবণতা, আর ভেঙে পড়তে পারা এক দুর্লভ প্রাপ্তি! 


তবুও, সকালে বুক চিতিয়ে বলেছি, আমার নির্মোহতা ও প্রতাশাহীনতার কথা। বলেছি, একা একা জিতে নেবার আশ্চর্য প্রতিজ্ঞার কথা! এসব বলার পরেও কিছু বলতে চাওয়া থাকে। বলতে না পারা থাকে৷ এই বলতে চাওয়া অথচ না পারার উপর জমা হয় বিন্দু বিন্দু অভিমান৷ 


বিন্দুতে সিন্ধু হয় কী না জানি না, তবুও বিন্দু বিন্দু অভিমান জমে কোনো এক রবিবার, দুপুর থেকে জোর বৃষ্টি হয়! 

মা বলে ঈশাণ কোনে মেঘ জমেছিল প্রচুর! 

মানুষের ঈশানকোণ কোনদিকে? আমি ঠিক জানি না!


আবির  মুখোপাধ্যায় 



Wednesday, 21 April 2021

স্নায়ুতন্ত্রে ( মুক্তগদ্য ) - মধুমিতা মৈত্র লাহিড়ী

 মুক্তগদ্য


বীজ ,মাটি , জল, বায়ু একত্রিত হয়ে নিখাদ সুতোর বিনুনিতে বেড়ে ওঠে একটি সরস রসালো সংবেদনশীল শরীর। গোড়া থেকে যার
আগা অবদি প্রতিটি রোমকুপে অনু পরমানুতে বয়ে চলে জীবন।চামড়া অস্থি প্রতিটি অংশে কথা হর্ষ কখনো বিষন্নতা। মহিরূহ জানান দেয়
কখোন সে বালিকা আবার কখোন সে যুবতী নাকি যুবক। অন্যথায় কখোন সে বাল্যাবস্থায় রয়েছে ,আবার কখোন যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে
পৌঁছালো। ঠিক একটি নিটোল মানুষ এই একেক টি গাছ।
       ....শিশুর মতো  নিরবিচ্ছিন্ন সরল ভোরবেলা আসে , ছলছল কলকল করে কতো
পাখি এসে বসে প্রতিটি পাতা ছুঁয়ে যায় তাদের
আদোর। আদোর খেতে খেতে কখোন সূর্যদেব
মাথার উপর দৃঢ হতে থাকে তা অজানাই থাকে।
গাছ যেন ভুলে যায় হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হয়, যেমন
করে শিশু বাল্যকাল ছাড়িয়ে শারীরিক পরিবর্তন দেখে  কদাচিত থমকে যায়।
                এর পর আসে বড় একখানা দুপুর যখন এই মহিরূহ না জানি কর্মজীবন টা বিস্তারিত করে - কিন্ত সেভাবে নাম পায়না।
পথিক আশ্রয় নেয় ছায়ায় আবার যখন চলে যায় তখন গাছের সারি দেখে মোনে লোভ জাগে, যদি কুঠারের আঘাতে কিছু বনরাজি
কাটা যেত তবে ধনের বেশ আগম হতো। আসতে হবে কোন দিন বিশেষ প্রস্ততি নিয়ে।

রাত  গাঢ হয় যখন স্নায়ুতন্ত্রে চলে অন্য হিল্লোল,
পা থেকে মগজ অবদি ঠিক মানুষের মতো এঁরাও রোমাঞ্চিত হতে থাকে। জগৎ সংসারের আড়ালে এক অন্য পৃথিবী অন্য এক বৃন্দাবন
তৈরী হয় সেখানে। চাঁদের আলোতে মহিরূহ সারি কি স্পষ্ট কি দীপ্ত।সনসন করে বাতাস বয়ে
যায় ,গাছ  গুলির  উপর যেন বাঁশি বাজিয়ে দেয়। তারা আনন্দ প্রকাশ করে অঙ্গীকার করে
অন্য এক পৃথিবীর। যেখানে কুঠার নেই , নেই
কোন স্বার্থপর কাঠুরিয়া, শুধুই পাখির কলকাকলি  বাতাসের ঢেউ আর ঘন সবুজ বনরাজি। যেখানে গাছের শিকড় বাকল আর
অস্থিসম ডালপালা নির্ভয়,  শিশুর মতো মাটির
জঠরে  পৌঁছে দেবে মুক্ত স্নায়ু স্রোত।


মধুমিতা মৈত্র লাহিড়ী


Tuesday, 20 April 2021

অনামী সম্পর্ক - নন্দিনী সাহা

 

মুক্তগদ্য

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে কোন না কোন সময় এমন একজন মানুষ এসেছে বা আসে,তাদের সাথে না চাইতেই হয়তো আমরা জড়িয়ে পড়ি,আঁকড়ে ধরতে চাই,রাতের পর রাত জেগে গল্প করি,অপেক্ষা করি কথা বলার জন্য,কিংবা একটিবার তার আওয়াজ শোনার জন্য ছটফট করি,জাস্ট ভীষণ ভাবে জড়িয়ে পড়ি।

অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করে..
আবার ভালোবাসতে ইচ্ছে করে,অপেক্ষা করতে ভালো লাগে,সাজতে ইচ্ছে করে,চোখে কাজলটা আরেকটু গাঢ় করে পড়তে ইচ্ছে করে,নিজেকে সাজাতে ইচ্ছে,তার পছন্দের রঙের শাড়ী কিংবা কুর্তিতে নিজেকে বারবার আয়নাতে জরিপ করতে ইচ্ছে হয়,কেমন লাগছে নিজেকে,কী বলবে সে আমাকে,যখন আমাকে দেখবে!
এমন অনেক ভাবনার খেয়ায় আমরা ভাসতে থাকি।

অানমনেই অন্যকে ডাকতে গিয়ে তার নাম নিয়ে ফেললে পরক্ষণেই জিভ কেটে নিজের মাথায় দুটো চাটি মেরে 'ধ্যাৎ কী যে আমার হলো' বলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠি।

ইচ্ছে করে জ্বরও বাঁধিয়ে ফেলি কখনো,কেবল তার থেকে আদুরে বকুনি শুনবো বলে।

হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষগুলিও আবার হাসতে শেখে।চোখদুটিই জানান দেয় ভেতরের খুশির খবর।

দেখা হলে শরীর ছোঁয়ার চাওয়া থাকে না,কেবল ভালোলাগার চাহনি থাকে,অনামিকা কনিষ্ঠায় আদুরে আলাপ থাকে।কিংবা কোনো একটা বিকেল,তার নামে লিখে দিতে ইচ্ছে করে।শুধু তার কথা শুনবো বলে,কাছ থেকে দেখবো বলে,এর বেশি আর কিছু চাওয়া থাকে না, চাহিদা থাকে না।

যোগাযোগ ছিন্ন হলেও কাদা ছেঁটায় না ওরা,থেকে যায় ওরা ডায়েরীর পাতার লুকোনো প্রথম প্রেমে পাওয়া শুকিয়ে যাওয়া অবিচ্ছেদ্য গোলাপের মতো।
সেই গোলাপে কোনো গন্ধ থাকে না,কিন্তু স্পর্শ করলে সেই আদুরে আলাপের দিনগুলো দৃষ্টিপটে ভেসে ওঠে,যা মনকেমনের দিনগুলোতে জড়িয়ে রাখে ভালোলাগার আবেশে,ঠিক মায়ের হাতে বোনা নকশিকাঁথার মতো।

কিছু সম্পর্ক শুরু হয়,কিন্তু নাম পায় না,সামাজিক পরিচিতি পায় না।তবুও অনামী হয়েও,ভীষণ দামী হয়ে রয়ে যায়।কী তাই না?


নন্দিনী সাহা


পুস্তক পর্যালোচনা - গোবিন্দ মোদক

 

পুস্তক: স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু।
সম্পাদক: সুদেষ্ণা চক্রবর্তী।
প্রকাশক: শরৎশশী,  হাওড়া।
পর্যালোচক: গোবিন্দ মোদক।


            করোনা আবহে বিশেষভাবে অবকাশ পাবার দরুণ কবি-লেখক-শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতাকে আরও বিকশিত করবার সুযোগ পেয়েছেন --- প্রকাশিত হয়েছে অজস্র কবিতার বই, ছড়াগ্রন্থ, অণুগল্প সংকলন, গল্পগ্রন্থ ইত্যাদি ; তবে ভিন্নধর্মী গদ্যগ্রন্থ তথা অনুপ্রেরণামূলক গ্রন্থের সংখ্যা যথেষ্টই নগণ্য --- তবু তারই মধ্যে সুলেখিকা সুদেষ্ণা চক্রবর্তী সম্পাদিত 172 পৃষ্ঠার "স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু" গ্রন্থটি তার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম যেখানে প্রকৃত অর্থেই ছিন্নমূল একজন সাধারণ নারীর জীবন সংগ্রাম ও মহিয়সীতে উত্তরণের ঘটনাগুলিকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে এক ভিন্নধর্মী জীবনালেখ্য তথা সংগ্রামের কাহিনী, যা আরও আরও বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষকে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, স্বাবলম্বী হয়ে উঠবার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আসুন, "তমসো মা জ্যোতির্গময়" -- এই উপনিষদবাণীকে স্মরণ করে গ্রন্থটির অন্দরমহলে একটু উঁকিঝুঁকি দিতে চেষ্টা করি।

           যদিও শ্রীমতি মঞ্জু দাস (১৯৫২-২০১৯) তেমন স্বনামধন্যা কোনও মহিয়সী রমণী নন যাঁকে নিয়ে খবরের কাগজে কলম লেখা হয়েছে বা দূরদর্শনে তা  সম্প্রচারিত হয়েছে --- তথাপি তিনি সেই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের একজন যিনি স্বজনহারা হয়ে মাত্র তিন বছর বয়সে উদ্বাস্তু হয়ে এপার বাংলায় এসে বিভিন্ন অনাথ আশ্রমের নিপীড়িত, কুয়াশাচ্ছন্ন জীবনের অনিশ্চয়তাকে জয় করে 'সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্' এর পথ ধরে আজীবন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন --- অসংখ্য শিশু-কিশোর মনে জ্ঞানের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত করে গেছেন। সমস্ত প্রতিকূলতাকে অসীম মানসিক শক্তিতে অতিক্রম করে নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিচল ভাবে এগিয়ে গেছেন। হয়তো আক্ষরিক অর্থে তিনি খ্যাতির সেই শীর্ষে পৌঁছুতে পারেননি, কিন্তু অখ্যাতির শেষ ধাপ থেকে উঠে এসেছেন নিরন্তর সংগ্রামের পথ অবলম্বন করে --- এবং এভাবে তাঁর সেবা, সততা আর সু-কর্ম দিয়ে খুব সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক বিদগ্ধ মানুষজনের স্মরণে-মননে স্থান করে নিয়েছেন।

             কিন্তু তার এই যাত্রাপথ সর্বদা মসৃণ বা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না --- এক মুঠো ভাত পাবার আশায় অনাথ আশ্রমে তাঁকে যেমন রান্নার ঠাকুর ও জোগাড়ে মাসিদের গাদা গাদা জামা-কাপড় কেচে দিতে হয়েছে, তেমনই পরবর্তীতে অর্থাভাবে বিভিন্ন বাড়ির বাচ্চাদের পড়িয়ে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে নিজেকে স্নাতক স্তরে উন্নীত করেছেন, বেসিক শিক্ষকতার ট্রেনিং কোর্সে ডিপ্লোমা করেছেন। এভাবে লক্ষ্য স্থির রেখে অদম্য মনোবল পাথেয় করে পৌঁছাতে পেরেছেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে --- নিজেকে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছেন শিক্ষকতায়, মানুষের সেবায়, সাহিত্যচর্চায় ও পত্রিকা সম্পাদনায়।

             শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা মা ও বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে দীক্ষিত মঞ্জুদেবী ছিলেন মানুষের সেবাধর্মে নিবেদিতপ্রাণা। তাই তো তাঁর এই সু-কৃতি মানুষের মনের পাতায় এতোটাই ছাপ রেখেছে যে শতাধিক বিদগ্ধ ব্যক্তি (অধ্যাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, কবি, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী, প্রতিবেশী এবং সাধারন মানুষ) তাঁর এই কর্মময় জীবনকে কুর্নিশ জানিয়ে শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় স্মরণ করেছেন .... যার সারাংশ বিধৃত হয়েছে "স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু" শীর্ষক সংকলন গ্রন্থটির মর্মর পাতায় পাতায়। আশা করা যেতেই পারে যে তাঁর জীবন সংগ্রাম এবং উত্তরণের এই অধ্যায় অনেক হেরে যাওয়া অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। আর ঠিক সেইখানেই গ্রন্থটির সার্থকতা।

             গ্রন্থটির উপরি পাওনা হলো মঞ্জুদেবীর বেশ কিছু আলোকচিত্রসহ তাঁর সাহিত্যচর্চার বেশ কিছু উৎকৃষ্ট নিদর্শন যা গ্রন্থটিতে মান্যতার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে । ঝকঝকে নির্ভুল ছাপা, উৎকৃষ্ট কাগজ, মজবুত বাঁধাই এবং মালটিকালার ল্যামিনেটেড প্রচ্ছদ বইটিকে প্রকৃত অর্থেই দৃষ্টিনন্দন করেছে এবং বইটির গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বইটির প্রকাশক হলেন শরৎশশী, অবিনাশ ব্যানার্জি লেন, হাওড়া- ৭১১১০৪ ( মুঠোফোন:  ৯৪৩২১০৯৯১৭) এবং প্রাপ্তিস্থান পাতাবাহার, কলেজ স্কোয়ার ইস্ট, কলকাতা-৭৩, স্টল নম্বর দশ-এগারো। এছাড়াও ধ্যানবিন্দু (স্টল নম্বর পাঁচ-ছয়) এবং অন্যান্য পরিবেশকের কাছে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। বইটির মূল্য মাত্র দেড়শো টাকা। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।


পুস্তক: স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু


‘বাংলার সংস্কৃতি’ - শ্রীমন্ত সেন

 

                                  প্রবন্ধ


সংস্কৃতির ইংরাজি হল ‘কালচার’ অর্থাৎ কর্ষণ বা কৃষ্টি। রামপ্রসাদের আক্ষেপ, “এমন মানব-জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।” বাঙালির জীবন-জমিনে অবশ্য সোনার ফসলের অনুপপত্তি নেই। সে যে কোনও দিকেই হোক না কেন— অর্থাৎ ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, পালপার্বণ, শুভ উৎসব, যাত্রা-নাটক, চিত্রকলা, দর্শন, বিজ্ঞান, জীবনশৈলী, জীবনভাবনা, কিংবদন্তী, পুরাণ, পরিমণ্ডল-- সকল ক্ষেত্রেই

        সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি প্রথমে ভারতীয়, তারপর হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক ইত্যাদি। তারপর বাঙাল-ঘটী— তারও পর নাগরিক ও গ্রামীণ ইত্যাদি। প্রথমে বাহ্মণ্যধর্মের তেজোমহিমা, ক্ষীয়মাণ গৌরবের মধ্য থেকে উৎসারিত স্বার্থপরতা, নীচতা, ভেদাভেদ-জ্ঞান, পরধর্ম-অসহিষ্ণুতা। তারপর বৈষ্ণবধর্মের প্লাবনে বাঙালির আত্মনিমজ্জন— কবির কথায়, “বড় বৃষ্টি হয়ে গেছে ‘চৈতন্যের’ বাঙালি জমিতে, কর্দমে মেলে না পাদপীঠ”

        বাঙালির মানস-ভুবনে শাশ্বত ধর্মের মহাজ্ঞান, চিদানন্দময়ী শক্তির প্রকাশ, বৈষ্ণবীয় ভক্তিপেলবতা, ব্রাহ্মধর্মের ‘একামেবাদ্বিতীয়ম্‌’-এর অভ্রংভেদী ‘ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য’ মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। তাই সেখানে ‘উদারচরিতানাং তু বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’। ফলস্বরূপ বাঙালি এক দিকে যেমন ‘বজ্রাদপি কঠোরাণি, মৃদুনি কুসুমাদপি’, তেমনই পৌত্তলিকতায় বিশ্বরূপদর্শী আবার অরূপরতনে স্বরূপপ্রিয়, তাই তারা অনায়াসে ‘প্রিয়রে দেবতা বানায়, দেবতারে প্রিয়’

        বাঙালির যেমন ঠাকুরমার ঝুলি, পঞ্চতন্ত্র, বর্ণপরিচয়, হাসিখুশি, বুড়ো-অ্যাংলা, ভূতপত্‌রীর দেশে, নালক, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণকথা, হযবরল, আবোল তাবোল, পাগলা দাশু আছে, ঠিক তেমনই আছে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ থেকে জীবনানন্দ, সমরেশদ্বয়, সুনীল, শীর্ষেন্দু, বিষ্ণু, শক্তি, নীরেন্দ্রনাথ, শঙ্খ প্রমুখ জীবনে জীবন যোগকারী প্রথিতযশা সাহিত্যকার। যেমন ডমরুচরিত, গোপালভাঁড়ীয় রসগল্প, রসময়ীর রসিকতা, ধূস্তরীমায়া, ভূশণ্ডির মাঠ, লালু, রসে বশে আছে, তেমনই আছে অব্যক্ত, লোটাকম্বল, দেবতাত্মা হিমালয়, কোথায় পাব তারে, সেই সময় ইত্যাদি। বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গ বাংলা সাহিত্যের এই রসবৈচিত্র্য মনে করিয়ে দেয় ‘রসো বৈ সঃ’

        বাঙালি না হলেও কালিদাসকে বাঙালি আত্মীয়করণ করে নেয় তাঁর বাগ্‌দেবীর কাছে প্রার্থনা ‘অরসিকেষু রসস্য নিবেদনং শিরসি মা লিখ, মা লিখ, মা লিখ’ সহ। বিদ্যাসাগরের প্রাণবন্ত বাংলায় কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌’-এর অংশবিশেষ অনুবাদে ‘শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা’ হয়ে ওঠে বাঙালি নববধূর চিরকালীন পতিগৃহ গমনের উজ্জ্বল উদ্ধার দৃষ্টান্ত।

        কাব্যের নৈবেদ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন দেবী সরস্বতীকে নন্দিত করেন, তেমনই নজরুল সঞ্চিতা, বিষের বাঁশি প্রভৃতি কাব্য দিয়ে অন্যায় অবিচার পরাধীনতার লৌহকপাট ভাঙতে চান, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছন্দ স্বাচ্ছন্দ্যে বন্দনা করেন ছন্দসরস্বতীর। সুনীলের কাব্য-প্রেয়সী নীরা হয়ে যায় সর্বজনীন দয়িতা, জীবনানন্দের বনলতা সেনও রূপান্তরিত হয় হাজার বছর ধরে কামনা করা এক রহস্যময়ী নারীতে। বিষ্ণু দের ‘স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যত’ হয়ে ওঠে বাঙালির স্মৃতি, সত্তা ও ভবিষ্যৎ।

        বাংলা সংস্কৃতির জীবনসরস্বতী হল বাংলা সঙ্গীত। যুগে যুগে সেই সঙ্গীত প্রবাহিনী বাঁক নিয়েছে নূতন থেকে নূতনতর দিকে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ভজন, টপ্পা, ধর্মসঙ্গীত, রামপ্রসাদী, কীর্তনাঙ্গের গান, রবিবাবুর গান, লোক সঙ্গীত, ভাটিয়ালি, জারি, ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, ঝুমুর, টুসু-ভাদুর গান, বাউল, দেহতত্ত্ব, আগমনী গান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদী, দ্বিজেন্দ্রগীতি, স্বর্ণযুগের গান সহ আধুনিক গান থেকে বর্তমানের তথাকথিত জীবনমুখী গান মায় ব্যান্ডের গান বাঙালির মানস-মৃত্তিকাকে করেছে রসসিক্ত, নন্দিত।

        তাই বাঙালি যেমন গাইতে পারে ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে / বসন্তের বাতাসটুকুর মতো’, তেমনই পারে হৈমন্তিক নিবেদন ‘ওগো যা পেয়েছি, সেইটুকুতেই খুশি আমার মন, কেন একলা বসে হিসাব কষে নিজেরে আর কাঁদাই অকারণ’ বা মান্না দের মন-কেমন-করা গান ‘বড় একা লাগে, এই আঁধারে মেঘের খেলায়, আকাশ পারে’-তে গলা মেলাতে। কিংবা হাল আমলের অনুপম বিনতি ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ বা প্রতুলনীয় বঙ্গবন্দনা ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই’ হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের আরাম। বর্ষণমুখর রাতে বাঙালির আর্তপ্রকাশ দেখতে পাই ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’ বা ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে’ গানের আকুলতায়। তেমনই এমন কোনও জীবন-মুহূর্ত নেই, যেখানে সপ্রাণ অনুভূতি প্রকাশের জন্য বাঙালির কাছে কোনও ‘গীতাঞ্জলি’ নেই।

        কথায় বলে ‘বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ’— যেখানে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী, দুর্গা-কালী-সরস্বতী-কার্তিক-জগদ্ধাত্রী ইত্যাদি পুজো থেকে মহরম, রমজান, ইদ, বড়দিন, ছট প্রভৃতি বাঙালির জীবনশৈলীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। মহালয়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত মাতৃবন্দনা ‘যা দেবী সর্ব্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ নমো নম।।’ বা সুপ্রীতি ঘোষের অপার্থিব কণ্ঠে ভক্তি-অঞ্জলি ‘বাজল তোমার আলোর বেণু, মাতল রে ভুবন’ প্রভৃতি ইতিমধ্যেই বাংলার সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে গেছে

        পূর্বজদের জন্য বাঙালি আকাশ-প্রদীপ জ্বালে, নবাগতদের মঙ্গলে করে ষেঠেরা (ষষ্ঠী) পূজার মঙ্গলাচরণ। বঙ্গবধূ অশুভ দৃষ্টি থেকে শিশুকে রক্ষা করতে তার পাশ কপালে লাগায় কাজলের ফোঁটা।  বঙ্গনারী দেবীকে ঘরের মেয়ে বলেই মান্যতা দেয়। ফলে বিসর্জনে মা হিসাবে কনকাঞ্জলি গ্রহণ করে, নিজেরা পরস্পরের মঙ্গলকামনায় সিঁদূরখেলায় মাতে। শাশুড়ি মা জামাই ষষ্ঠীতে জামাই আদরের সঙ্গে পাখার বাতাস দিয়ে তার বিপদ-বালাই দূর করে, বোনেরা ভাতৃদ্বিতীয়ায় ভাইফোঁটা দিয়ে যম-দুয়ারে কাঁটা বিছায় অপি চ বাঙালি থেকে ভারতীয়ত্বে উত্তরণের ফলে ভাইয়ের হাতে রাখিও পরায়, ইতু (ইন্দ্র) পূজার মাধ্যমে বাঙালি শস্যপূর্ণা বসুন্ধরার স্বপ্ন দেখে, ঘেঁটু (ঘণ্টাকর্ণ) পূজার মাধ্যমে সন্তান-সন্ততিদের রোগবালাই দূর করার অভিলাষ করে।

        বাঙালি হিন্দু সত্যপীরের দরগায় সিন্নি-বাতাসা চড়ায় মনস্কামনা পূর্ণ হলে, সংসারের মঙ্গলকামনায় সত্যনারায়ণ পূজার আয়োজন করে। বিপরীতে কোনও বাঙালি মুসলমান রমণী সীমন্তে সিঁদূর ধারণ করে স্বামীর হিতকামনায়। সত্যিই বড় বিচিত্র এই বাংলার সংস্কৃতি!

        আর চিত্রকলায়? রবি বর্মার শিব-পার্বতী বিষয়ক চিত্রকলাকে বাঙালি আত্মীয়করণ করেছে, বাঙালির প্রতিভূ উদয়শঙ্কর নৃত্যের অঙ্গনে সম্প্রতি-প্রয়াতা জোহরা সেহগলের সাহচর্যে সেই শিব-পার্বতীকে রূপদানের মাধ্যমে অবিনশ্বর করেছেন। ‘ছবিলেখক’ অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ চিত্র, রবীন্দ্রনাথের বিমূর্তধর্মী নারী অবয়ব, নিসর্গ চিত্র, গগনেন্দ্রনাথের ঘনকীয় চিত্র, সমাজে প্রচলিত অন্যায়-কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কশাঘাতকারী ব্যঙ্গচিত্র, যামিনী রায়ের  অতিসরল জননী প্রতিকৃতি (যা দেখলেই ‘মা বলিতে প্রাণ করে আন চান, চোখে আসে জল ভরে), নন্দলাল বসুর স্বল্পরৈখিক মানব তথা নিসর্গ চিত্র থেকে বিকাশ ভট্টাচার্যের মানবীর মধ্য দেবীসন্ধান, ধাবমান অশ্বের বিচিত্র ভঙ্গিমা, গণেশ পাইনের লোকায়ত ভাবের ঐশ্বরীয় মহিমায় উত্তরণশীল চিত্রায়ণ, তাঁর ‘পোয়েটিক স্যুর-রিয়েলিজম’ বাংলার সংস্কৃতিকে একই সঙ্গে ঋদ্ধ ও ধারণ করেছে। এছাড়া কালীঘাটের পট, পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত-সাম্প্রতিক ঘটনা বিষয়ক বাংলার পটচিত্র (পটের গান সহ), নকশি কাঁথা, মন্দিরগাত্রে খোদিত ইতিহ্যবাহী চিত্রকলা ইত্যাদি বাংলার সংস্কৃতির সরল অথচ ভাবগম্ভীর আত্মপটসাধনা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়।

        চলচিত্রের মৌন, মুখর দু’টি যুগেই বাঙালির অবদান আজ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী(ডি. জি.) থেকে সত্যজিৎ রায় দীর্ঘপটে জীবনের বিচিত্র প্রকাশে চলচ্চিত্রের অভিধাই বদলে দিয়েছেন। সে পথের পাঁচালি হোক বা পরশপাথর, তার পরশে বাঙালির মননভূমি ‘কষিত কনককান্তি, কমনীয় কায়’। ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে  ঢাকা  তারায় মৃত্যুপথযাত্রিণী নারীর আকুল আর্তনাদ “দাদা আমি বাঁচতে চাই, দাদা আমি বাঁচতে চাই’’ চিরকালীন জীবনতৃষ্ণায় পরিণত। কিংবা তাঁর ‘যুক্তি, তক্কো, গল্প’-এ ‘কেন চেয়ে আছো গো মা মুখপানে’-তে বিশ্বাস ও স্বপ্নভঙ্গের যে বিশ্বাস্য চিত্রকল্প দেখি, তা বাঙালির হৃদয়বীণায় চিরকাল বিষণ্ণ ভৈরবী রাগিনী অনুরণিত করতে থাকবে।

        পরিধানে বাঙালিকে বিশিষ্ট করেছে ধুতি, পাঞ্জাবি, শাড়ি, ইত্যাদি। কিন্তু কর্মস্বাচ্ছন্দ্য ও বিশ্বপ্রবণতার প্রয়োজনে বাঙালি প্যান্ট-শার্ট-সালোয়ার-কামিজ-লেহেঙ্গা-চোলিতেও সমান স্বচ্ছন্দ। তাই কবি বলেছেন, ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’। সাধারণভাবে না হলেও, বিবাহাদি উৎসবে বাঙালির অঙ্গে মুগোর ধাক্কাপাড় কোঁচানো ধুতি, শৈল্পিক কাজ করা পাঞ্জাবি, উজ্জ্বল বেনারসি ইত্যাদি অনন্যসাধারণ হয়ে ওঠে। যুগের সঙ্গে বাঙালি সমান প্রাগ্রসর। যুগের প্রয়োজনেই তাই ‘বিদেশী বর্জন’ আহ্বান ‘ছেড়ে দাও রেশমি চুড়ি, বঙ্গনারী, কভু হাতে আর পরো না’ কিংবা ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নেরে ভাই/ দীন-দুখিনী মা যে তোদের, এর বেশি আর সাধ্য নাই’— তাদের কাছে দেশমাতৃকার আহ্বান  হয়ে ওঠে, তাই তারা সহজেই সাড়া ও মান্যতা দেয়।

        আবার খেলার মাঠে বাঙালিই পারে তার ঊর্ধ্ববাস খুলে তারুণ্যের বিজয়কেতন ওড়াতে। কারণ সেই ঔপনিষদ মন্ত্র তার মনে সাহস জোগায় ‘অপাবৃণু! অপাবৃণু!!’ (আবরণ উন্মোচন করো। আবরণ উন্মোচন করো।) ‘আত্মানং বিদ্ধি’ (আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি কর, আর অনুভব ও ঘোষণা কর যে যে তোমরাও অমৃতস্য পুত্রাঃ)

        বসনের মত অশনেও বাঙালির স্বকীয়তা অনস্বীকার্য। সঘৃত অন্নব্যঞ্জন, যার মধ্যে সুক্তো-ডাল-পোস্ত-শাক-কালিয়া-ইলিশ রোহিতাদি মৎস্যের প্রাবল্য, ছাগ-কুক্কুট মাংসের অনায়াস পৌষ্টিক উপস্থিতি, পায়স-পিঠা-দধি- সন্দেশ-রসগোল্লা-পান্তুয়া-ল্যাংচা- লবঙ্গলতিকা-মিহিদানা-সীতাভোগের সরস সঙ্গত এবং মুখশুদ্ধি অম্বলাদির পরিপাকীয় অনুপান উল্লেখনীয়, বাঙালিকে ‘অন্নময় প্রাণ’-এর সন্ধান দেয়।

        প্রকৃতপক্ষে বাংলার সংস্কৃতিতে মহামিলনের বীজ উপ্ত দেখতে পাই। কবি রবীন্দ্রের অনুভব ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি/ জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি’। সমান্তরালভাবে ভারত পথিক রামমোহন, বিশ্ববিবেক বিবেকানন্দের হাত ধরেও বাঙালিও তাই বিশ্বমানবতা তথা বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধে অনুপ্রাণিত।

        তাই বাংলার সংস্কৃতি বলতেই জীবনের চলার পথে প্রয়োজনীয় কতকগুলি মূল্যবোধের কথা মনে পড়ে যায়। গুরুজন ও অগ্রজদের প্রতি শ্রদ্ধা সম্ভ্রম (পিতৃদেবো ভব, মাতৃদেবো ভব বিধায়), অনুজদের প্রতি সস্নেহ প্রশ্রয়, দীনার্তদের অভয়াশ্রয়, আগামী পুরুষের জন্য প্রার্থনা (‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ বা ‘প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’), সমবয়স্কদের প্রতি বিনম্র ব্যবহার, সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, অল্পেতে তুষ্ট থাকা (সন্তোষম্‌ ওষধিঃ), বিদ্যোৎসাহ (নাস্তি বিদ্যা সমা শক্তিঃ), বিনম্রীভাব, অপরের প্রতি দ্বেষহীনতা (মা বিদ্বিষামহে), আপন ধর্ম বা সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও পরধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সহিষ্ণুতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থেকেও প্রতিবেশীদের প্রতি মমত্ববোধ, মানুষকে দেবাংশী জ্ঞানে সেবা, পরবাসে গিয়েও নিজ শিকড়ের প্রতি নাড়ির টান ইত্যাদি।

        রবীন্দ্রনাথ দেশকে ‘ভারততীর্থ’ অভিধা দিয়েছেন। বাংলা সেই তীর্থের মধ্য আর এক তীর্থ, এক অন্য কবির ভাষায় ‘আমরা বাঙালি বাস করি সেই তীর্থ বরদ বঙ্গে’। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাঙালি প্রাণের জোরে বেঁচে আছে, তাই ছন্দের জাদুকর কবি সগর্বে বলেছেন, ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি’। আবার এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রাণোচ্ছলতা দেখে গুপ্ত কবি বলেছেন, ‘কত ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা’। এই প্রতিকূলতার মাঝেও তাই আত্মসন্ধানী বাঙালি নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করে কবি শক্তির বকলমে ‘অবনী, বাড়ি আছো?’ যতদিন বাংলা থাকবে, বাংলার সংস্কৃতি থাকবে, বাঙালি থাকবে, ততদিন এই আত্মজিজ্ঞাসা চলতেই থাকবে, ‘অবনী, বাড়ি আছো?’ ‘অবনী, বাড়ি আছো? ‘অবনী, বাড়ি আছো?... ... 


শ্রীমন্ত সেন - হুগলি 

             

Monday, 19 April 2021

মকর পরব ও টুসুগান - সৃজিতা ধর

 

নিবন্ধ

 সারা বছরের হাঁড় ভাঙা খাটনিতে যখন শরীর আর মন দুটোই ক্লান্ত তখনই হালকা হিমেল পরশ নিয়ে প্রাণে উৎসবের জোয়ার নিয়ে আসে মকর পরব। বিখ্যাত এই কৃষিভিত্তিক লোক উৎসব টুসু পরব নামেও পরিচিত। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগণার আদিবাসী ও মূলবাসীদের কাছে এই মকর পরব বহু প্রতীক্ষিত এক লোক উৎসব। মকর পরব বা টুসু পরবের সাথে টুসু গানের এক নিগূঢ় সম্পর্ক যেখানে ধামসার তালে মন গেয়ে ওঠে- 
"মকর পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইনছে
টুসু মনি ধামসার ব্যুলে দিখো কিমন লাচিছে"
টুসু গানে সাহিত্যধর্মীতা নেই, আছে বক্তব্যধর্মীতা। তাই গানের বিষয়বস্তু যা কিছু হতে পারে। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সাবলীলভাবে প্রকাশ পায় এই টুসু গানের মাধ্যমে। 

               অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি- এই একমাস ব্যাপী এইসকল "সুনা দেহে ঘাম ঝড়ানো" মানুষগুলো এই উৎসব পালন করেন টুসু দেবীর পূজোর মাধ্যমে। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তির সন্ধ্যায় একটি মাটির পাত্রে তুষ রেখে তার ওপর ধান, দূর্বা, আকন্দ, বাসক ফুল, গাঁদা ফুলের মালা, আরও অনেক সামগ্রী রাখা হয়। পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত এই সকল সামগ্রী সম্বলিত পাত্রটিকে টুসু জ্ঞানে পূজো করা হয়। প্রতি বাড়িতে 'আউছি' চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে তৈরি করা হয় এই সময়। ঘরের মেয়ে রূপে পূজিত এই টুসু মনি নামকরণের পেছনে ধানের তুষ-কেই অনেকে মনে করেন; অর্থাৎ মনে করা হয় যে 'তুষ' থেকেই 'টুসু' নামটি এসেছে। টুসু দেবীকে কখনো মেয়ে রূপে, কখনো সখি রূপে পূজো করা হয়। টুসু গানের মধ্য দিয়ে আবার কখনো কখনো ভালোবাসার কথাও প্রকাশ পায়। টুসু গানে তাই বলা হয়েছে-
  "যা যা টুসু যা যা লো
       দেখা গেছে তোর পিরিত লো
   তোর পিরিতে মন মানে না
        বলি তোর পিরিতে আগুন জ্বলে না।"    
               
                পৌষ মাসের শেষ চারদিনের টুসু পরবের নাম- চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, আখান এবং মকর। চাঁউড়ির দিন গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে গোবর মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। তারপর চালের গুঁড়ো তৈরি করা হয়। বাঁউড়ির দিন অর্ধ চন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি, চতুষ্কোণাকৃতি পিঠে তৈরি করে চাঁছি, তিল, নারকেল ইত্যাদি সহযোগে পুর দেওয়া হয়। এই পিঠে গুলোকে‌ গড়গড়্যা পিঠে বলা হয়। বাঁউড়ির দিন রাতে সারারাত টুসু গানের মাধ্যমে টুসু জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়। পৌষ মাসের শেষ দিন অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির দিনটিকেই আমরা মকর সংক্রান্তি বলে থাকি যেটা তাদের কাছে মকর পরব নামে খ্যাত। এই একমাস ব্যাপী সময়ে গোটা গ্রাম সেজে ওঠে, জায়গায় জায়গায় নাচ-গান চলে, মেলার আয়োজন করা হয়। তাইতো লোকসংগীতে বলা হয়েছে-
               "পরব দিনে মেলায় যাব
               ধামসা মাদল সঙ্গে লিব
               সুরগুঞ্জা ফুটে লালে লাল
               তোর ঘুঙুরাটা দিবে লাকি তাল..."

মকর পরবের দিন টুসু মনিকে তারা স্থানীয় পুকুরে বা নদীতে ভাসান দেয়। উজ্জ্বল রঙিন চৌডালায় টুসু দেবীকে সাজিয়ে গানের সুরে হয় টুসু মনির বিসর্জন। বিসর্জনের মনখারাপে মেয়েরা গেয়ে ওঠে-
 "টুসু আমার খায় না কিছু
              শুখাই গেল চাঁদবদন
 রাত হইলে চান্দ্ ধইরে দেব
                কেন্দো না গো টুসুধন
 মোদের মনের এই বাসনা
               টুসুধনকে জলে দিব না।"

কিন্তু নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতে পারে না তাদের আদরের টুসু মনি। আবার দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষায় রেখে দিয়ে টুসু মনি বিদায় নেয়। ভাসানের সময় তাই শোনা যায়- "জল জল‌ করো টুসু/জলে তুমার কে আছে?" তখন‌ যেন টুসু মনি গানের সুরে বলে- "মনেতে ভাবিয়ে দেখো/জলে সসুর ঘর আছে।" 

             টুসু দেবীর বিসর্জনের পরে শুরু হয় মকর স্নানের‌‌ পালা। শিলাবতী, কংসাবতী, অজয় প্রভৃতি নদীতে তারা স্নান‌ সেরে কাপড় বদলে আসে। আমরা যেমন গঙ্গা স্নানকে পুন্য স্নান মনে‌ করি, তারাও এই মকর স্নানকে সেই পর্যায়েই ফেলে। তাইতো লোকসংগীতে বলা হয়েছে-
            "মকর দিনে অজয় লদী
                              গঙ্গার রূপ ধরে
             গঙ্গা সিনান ভবে মানুষ
                        অজয় সিনান‌ করে..."

বিশ্বায়ন ও নগরায়নের নাগপাশে আটকে যাওয়া বাঙালী লোকসংস্কৃতির মূল সুর এখনও এই ধরনের পরবগুলো ধরে রেখেছে। বহু সুখ-দুঃখের, বহু ওঠা-নামার পর তারা এই মকর‌‌ পরবের বা টুসু পরবের একমাস মনের সমস্ত গ্লানি মুছে একসূত্রে বাঁধা পড়ে 'বিনি সুতোর মালা' হতে চায়। এভাবেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে আমাদের বিভিন্ন সাঁওতাল পরগণা, লালমাটির বাঁকুড়া। মকর‌ পরবের গান, ধামসার তাল, মাদলের বোল, ঘুঙুরের শব্দ সব মিলিয়ে গ্রাম বাংলার রূপের যে পরিবর্তন ঘটে তা অভাবনীয়। মন চায় ধামসার তালে ঘুঙুরের তাল তুলতে আর সাথে থাকবে চির নূতন লোকসংগীতের সুর-

"মকর দিনে বিহান কালে গেল লদীর পার
হলুদ রাঙা মুড়ি খাইয়ে ঠোঁটের কি বাহার
রাঙা ঠোঁটে রাঙা মুড়ি দিখো‌ কিমন‌ মানাইনছে
মকর‌ পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইনছে।" 


সৃজিতা ধর - কলকাতা 


মন - তনিমা হাজরা

 

মুক্তগদ্য 

আমাদের বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম পঁচিশটি বর্ণকে যে স্পর্শবর্ণ বলা হয়ে থাকে তা আমরা সবাই জানি। ওষ্ঠ স্পর্শ করে উচ্চারিত প-বর্গের শেষ বর্ণ "ম" এবং দন্ত্য স্পর্শ করে উচ্চারিত ত-বর্গের শেষ বর্ণ "ন" নিয়েই মন কথাটির জন্ম। 
সর্বশেষ সবচেয়ে তীব্রতম স্পর্শ। আবার উচ্চারণ তত্ত্ব অনুযায়ী প্রত্যেক বর্গের ১ম, তয় এবং ৫ম বর্ণকে অল্পপ্রাণ বর্ণও বলা হয়ে থাকে। কারণ এই বর্ণগুলি উচ্চারণকালে সমস্ত প্রাণবায়ু বুকের ভেতর চেপে রেখে আমরা খুব অল্পই নির্গত করে থাকি।। 
তাহলেই বুঝুন ম এবং ন দুটি অক্ষর নিয়ে তৈরি "মন" এই শব্দটি এত গভীর কেন।। 
আমার কেন যেন মনে হয়েছে এটাও জীবতত্ত্বের দিক দিয়ে ভাবার বিষয়। দুটি অল্পপ্রাণ বর্ণসমন্বয় শরীরের ভেতর তার শ্বাসবায়ুর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে নিরন্তর।। 

আর আমরা মানুষকে চিনতে তার মনটাকে বুঝতেই চাইছি না। শরীর খারাপ হলে ডাক্তার ডাকছি কিন্তু মন ব্যাপারটাকে আমলই দিতে চাইছি না।। কিংবা অনেকক্ষেত্রেই শারীরিক অত্যাচার এর জন্য আইন আদালত বিচারব্যবস্থার শরণাপন্ন হচ্ছি কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীরব বা সরব মানসিক অত্যাচারগুলির একেবারেই প্রতিকার বা বিচার হচ্ছেই না।। 

বিত্ত কথাটা আমি ব্যবহার করব না, এক্ষেত্রে মেধা বা মনন শব্দটা আমার যৌক্তিক মনে হয়েছে। কারণ মনের সঠিক অনুধাবন বা মনের অসুখকে উদার মানবিক আধারে দেখা বা না দেখা উচ্চ বা নিম্ন মেধা বা মনন এর পরিচয় বহন করে।। 

অনেক ক্ষেত্রে এইসব নিম্নমননের মানুষদের দেখেছি মনের স্পর্শকাতর অবস্থায় অবস্থান করা  মানুষকে নিয়ে উপহাস, পরিহাস করতে। ও তো পাগল,  ও তো রাগী, ও তো বেয়াড়া, এসব আলোচনা চর্চা সেই মানুষটির সামনেই করছেন অথবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডময় নিন্দেমন্দ করে বেড়াচ্ছেন । কিন্তু কিছুতেই কাউন্সেলিং বা মনরোগবিশেষজ্ঞ এর কাছে নিয়ে গিয়ে সমস্যাটা মেটাবেন না। কারণ তাদের কাছে মনরোগবিশেষজ্ঞ মানে "পাগলের ডাক্তার" আর চিকিৎসা মানে " পাগলের ট্রিটমেন্ট"। 
তবে শুধুমাত্র পাশাপাশি অবস্থান করা মানুষেরাই নন। যিনি নিজে মনোরোগে ভুগছেন তিনিই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তার বা কাউন্সেলর এর কাছে যেতে রিভোল্ট করেন,  "কেন যাবো আমি কি পাগল"?? 

মন বলে আমি 
মনের কথা জানি না, 
তারায় তারায় উড়ে বেড়ায় 
মাটিতে সে নামে না। 
সাঁঝের তারা হাতছানি দেয় 
ভোরের তারা টানে, 
সাগর ঢেউয়ে ভেসে যায় সে 
কোন পারে কে জানে, 
দেহ আমার চলতে নারে 
বইতে নারে ভারে, 
হালকা হাওয়ায় পালকি চড়ি, 
কোথাও সে যে থামে না। 
মন বলে আমি 
মনের কথা জানিনা *****(হারমোনিয়াম সিনেমার সেই বিখ্যাত গান- লিরিক- তপন কুমার সিনহা)।।

একটি মন আর একটি শরীর মিলিয়ে এই দেহ। যার মধ্যে শরীর দৃশ্যমান আর মন অদৃশ্য। 

একটি সুন্দর শরীরের ভেতর লুকানো একটি অসুন্দর মন অথবা একটি অসুন্দর শরীরে নিহিত একটি সুন্দর মন অথবা সুন্দর শরীরে সুন্দর মন  এবং অসুন্দর শরীরে অসুন্দর মন বিবিধ প্রকার কম্বিনেশনই তো চোখে পড়ে। 

আবার দেখুন একটি বৃদ্ধ শরীরের মধ্যে তারুণ্যে ভরা একটি মন অথবা একটি তরুণ শরীরের ভেতর ঢের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ একটি মনন ও দেখা যায়। 

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে একটি দেহের ভিতর একসাথে সহাবস্থান করা একটি শরীর ও একটি মন যে সব সময় এক তালে নাচবে বা একসাথে হাঁটবে তার কোনো মানে নেই। বরং এই বিরুদ্ধতা বা দ্বন্দ্বের উদাহরণই নানা ক্ষেত্রে 
বেশি।  

পিতার শুক্রাণু আর মাতার ডিম্বাণু নিয়ে মাতৃগর্ভের ভেতর একটি শরীরের উৎপত্তি। শরীরের এই আকৃতি, রঙ, গঠন অথবা যৌনবিভাগ কি হবে তা নির্ধারণ করে শুক্রাণু বা  ডিম্বাণুর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য সেকথা জীববিদ্যা বলে, 
কিন্তু একজন মানুষের মন কেমন হবে সেটা নির্ধারণ হবে কিসে? 

একটি শিশু জন্মগ্রহণ করবার সময়ই কী নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্যর সাথে সাথে একটা মানসিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই জন্মায়, নাকি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং পরিস্থিতি তার মধ্যে একটি মানসিক গঠন তৈরি করে? 

আমি বলব দুটোই। 

একটি শিশু জন্মানোর সময় তার দেহের মধ্যে একটি নবজাত শরীরের সাথে সাথে একটি নবজাত মনও নিয়েই জন্মায়। অনুকূল বা প্রতিকূল পরিস্থিতির ঘাত প্রতিঘাতে যেমন শরীরের বৃদ্ধি, ক্ষয় বা ভাঙচুর হয় সেগুলো আমরা চোখে দেখতে পাই তাই বলি, আহা তোমাকে এমন কাহিল লাগছে কেন হে, ঠিক ঠাক খাওয়া দাওয়া করো, একবার চেকআপ করাও, দেখো টেষ্ট রিপোর্ট সব ঠিক আছে তো? 
শরীরের রোগের নানা নাম আছে এবং ধ্বংস করার গুরুত্ব অনুযায়ী আছে তাদের নিরাময় বা মৃত্যু। 

কিন্তু মন বস্তুটাকে যেহেতু আমরা চোখে  দেখতে পাই না তাই এর স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে একেবারেই মাথা ঘামাই না। শেষ মেষ পরিস্থিতি যখন আমাদের কন্ট্রোলের বাইরে চলে যায় তখনই সেটা একটা সাংঘাতিক ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্ম দেয়।। 

এই ধ্বংসাত্মক ঘটনা সেই ব্যাক্তি বিশেষের মানসিক রোগের প্রাবল্য বা বৈশিষ্ট্যের বিভিন্নতা অনুযায়ী আত্মহত্যাপ্রবণতা  কলহপরায়ণতা, ধর্ষণপ্রবণতা, হত্যাপ্রবণতা, চৌর্য্যবৃত্তি, অত্যাচারমনষ্কতা অথবা আরও নানাপ্রকার  ক্রিমিনাল অবসেশন অথবা এগজিবিশনিজম কিংবা নির্লিপ্ত জনবিমুখতা আবার ফ্ল্যাকচ্যুয়েটিং এ্যাক্ট ডিস অর্ডার যা  কিছু হতে পারে।। 


এটা তো আমরা আমাদের চারপাশে প্রায়শঃই দেখি যে একজন পুরুষদের মতো গলার স্বর, দেহের বলিষ্ঠতা এবং শ্মশ্রুগুম্ফ নিয়ে কিছু মানুষ নারীর মতো আচরণ করেন অথবা সাজগোজ করে  আমাদের আশেপাশে ঘোরেন। 
এঁদের আমরা "লেডিস", ক্যাওড়া, হিজড়ে বলে ব্যঙ্গ করি। কেউ কেউ লজ্জা এড়াতে এঁদের সংসার থেকে নির্বাসন দেন। ফলে এঁরা শিক্ষাগত বা পারিবারিক সম্পত্তিগত ব্যাপারে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নেন।  এঁদের দুটো পয়সা দাক্ষিণ্য করে নিজেকে খুব দানবীর মনে করি। কিন্তু এঁদের এই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা তো আমাদেরই একপ্রকার শোষণ তাঁদের প্রতি। 

আবার এও দেখা গেছে যারা তাঁদের একেবারে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিই না, লেখাপড়া শেখাই, তাঁরা  সংসারে এইরকম একজন মানুষ থাকলে তাঁকে  যথাসাধ্য পুরুষ সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করি। জোর করে একজন নারীর সাথে বিবাহও দিয়ে দিই অনেক ক্ষেত্রে। 
কে দিয়েছে আমাদের এতবড় সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার?  কিভাবে পেয়েছি আমরা এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার? সেকি কেবলমাত্র আমাদের পুরুষ বা নারী শরীরে পুরুষ বা নারী মন জন্মগতভাবে  যথাযথ স্থিত আছে বলে?  

আর তাঁদের জন্মগত ভাবে এই যে পুরুষ শরীরে নারীমন অথবা নারী শরীরে পুরুষ মন তাতে তাঁদের কি কোনো হাত আছে?  তাহলে তাঁরা কেন আমাদের এই তথাকথিত সংখ্যাগরিষ্ট দৈহিক অবস্থানের মানুষের সমাজ থেকে ব্রাত্য হবেন? তাঁরা কেন একজন গোটা পুরুষ বা গোটা নারীর মতো স্বাভাবিক সম্মান পাবেন না?  কেন তাঁরা বারবার অযাচিত প্রশ্ন বা ব্যঙ্গের শিকার হবেন?  
তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে তাঁরা কেন যেকোনো জীবিকার জন্য পরীক্ষা দিয়ে মনোনয়ন পাবেন না?  কেন তাঁদের সংরক্ষিত শ্রেণীতে দরখাস্ত করতে হবে?  

একটি পুরুষ শরীর যখন একটি পুরুষ মন ধারণ করে এবং ভালবাসার বা ইন্দ্রিয়ের বোধে একটি নারীর শরীর ও মন বিশিষ্ট একজন জীবের প্রতি  আকর্ষিত হয় তখন  যৌনতা কালে একটি পুরুষাঙ্গের সাথে একটি স্ত্রী যৌনাঙ্গের মিলন ঘটছে। এটা একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। 

কিন্তু একটি নারী মন নিয়ে জন্ম নেওয়া পুরুষ শরীর কিন্তু একটি নারীর সাথে ভালবাসায় আকর্ষিত হচ্ছেন না বা ইন্দ্রিয়ের টানে একটি নারীর শরীর চাইছেন না, তিনি একজন পুরুষ মন, পুরুষ শরীর চাইছেন। তখন যৌনতা কালে স্বাভাবিক দুটি স্ত্রী বা পুরুষ যৌনাঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে তাঁরা শরীরের দুর্নিবার যৌন ইচ্ছাটিকে পায়ুকামের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করছেন। কারণ তাঁরা নিরুপায়, এক্ষেত্রে শারীরিক ইচ্ছাকে প্রশমিত করার জন্য দুটি স্বাভাবিক যৌনাঙ্গের উপস্থিতি নেই।। 

আমাদের ভন্ড সমাজ এখানেও ভালো মন্দ, নৈতিক অনৈতিক প্রশ্ন তুলে মুরুব্বি সেজে স্বঘোষিত বিচারক হিসেবে বিচার করতে এগিয়ে আসছেন। কিন্তু অত্যন্ত বাস্তব প্রাকৃতিক ব্যাপারটা কেউ দৃষ্টিতে আনছেন না বা আনতে না চেয়ে সাধু সাজছেন।। 

ভেবে দেখুন আপনি নিজেও এই সাধুদের একজন নন কি?  যিনি একটি পুরুষ শরীরে জন্মগতভাবে একটি পুরুষ মন নিয়ে কিংবা একটি নারী শরীরে জন্মগতভাবে  একটি নারী মন নিয়ে জন্মে গেছেন বলে নিজেকে একজন তথাকথিত স্বাভাবিক বলে দাবি করে এঁদের সাজগোজ, ভঙ্গি কিংবা যৌন জীবন নিয়ে  ক্রিটিসাইজ করার একটা জন্মগত হক পেয়ে গেছেন।  

এই আপনাদের প্রশাসিত আইন ব্যবস্থা  তাঁদের তৃতীয় লিঙ্গ নামকরণ করেই শুধু ক্ষান্ত হননি। এই পরামর্শও দিচ্ছেন যে  স্বাভাবিক দাম্পত্যে যেতে হলে শারীরিক অপারেশন ইত্যাদি করে একটি গোটা গোটা পুরুষ বা গোটা গোটা নারী হয়ে যাও।। অথবা এখন থেকে আমরা খুব মুক্তমনা হয়ে গেছি তাই তোমাদের শিক্ষা, চাকুরি তে আসন সংরক্ষিত রাখছি।।

কিন্তু কেন? 

একজন মানুষের জন্য আর একজন মানুষ কেন এভাবে স্বঘোষিত নিয়ন্তা হয়ে উঠবে? এইভাবে তাঁদের অস্বাভাবিক প্রতিপন্ন করে রাখার চেষ্টা করে শোষণ করা কি নিজেকে স্বাভাবিক হিসেবে জাহির করা প্রত্যেক জন আমাদের চূড়ান্ত অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থার পরিচয় নয়?? 

আপনি কি স্বীকার করার ক্ষমতা রাখেন নিজের এই মানসিক অক্ষমতা?? 


তনিমা হাজরা - কলকাতা 


নববর্ষের চিঠি - অদিতি মুখার্জী সেনগুপ্ত

 

পত্র সাহিত্য 

কল্যাণীয়েষু সুধিবৃন্দ, 

আমি তোমাদের সকলের প্রিয় পয়লা বৈশাখ বলছি। প্রতি বছরের মত আমি নতুন পরিধানে, নতুন আশা নিয়ে তোমাদের দরবারে আবার হাজির হলাম। 

জানি গতবছর অদেখা কোরোনার প্রকোপের ফলে সকলেই গৃহবন্দি ছিলে, তাই আনন্দটাও সেই ভাবে উপভোগ করতে পারোনি। 

এই বছরেও কোরোনার প্রকোপের ভয় কমেনি তবে যেহেতু এখন আর লকডাউন নেই, তাই আশাকরি একত্রে আনন্দে মেতে উঠতে পারবে। তবে নিষেধাজ্ঞার নিয়মগুলো মেনেই আনন্দে মেতে ওঠাটাই সঠিক বলে আমি মনে করি। 

আজকের দিনটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের। তোমরা সকলে ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে  আনন্দ ও উদ্দীপনায় মেতে ওঠো। এটা আমার কাছে খুবই গর্বের। যে কাজটা কোন ধর্ম -গুরু বা কালজয়ী নেতা তাঁর জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে করতে সক্ষম হয়নি, তা আমি পেরেছি। আমিই তোমাদের সকলকে একত্র করতে পেরেছি হাজারো প্রাণের মেলায়।

আজ তোমরা আমাকে যে ভালোবাসা দাও, আমি চাই সেই ভালোবাসার জোরেই তোমরা জীবনের পথে এগিয়ে যাও। 

কখনই মন খারাপ করবে না। তোমরা যারা প্রবাসী বাঙালি তারাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমার আসর জমিয়ে তুলো। আমিই তোমাদের মন রাঙিয়ে দেবো।তোমরা তোমাদের সোনামণিদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিও বারবার। 
যেদিন ওদের মুখে শুনব, "এসো হে বৈশাখ, এসো এসো",সেদিন ঠিক বুঝে নেবো আমিও পৌছে গেছি তোমাদের সাথে ধরার প্রতিটি প্রান্তে। সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম। 

তোমাদের সকলের বছরটা ভালো কাটুক, এই কামনাই করি। 

ইতি,
তোমাদের সকলের প্রিয় নববর্ষ।


অদিতি মুখার্জী সেনগুপ্ত - কলকাতা 


বঙ্গবন্ধুকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম - চিত্তরঞ্জন সাহা

 

মুক্তগদ্য 

তখন একটু বেড়ে উঠেছি। নবম শ্রেনীর ছাত্র। সম্ভবত ১৯৭৩ সাল। সারা শহর জুড়ে ব্যাপক মাইকিং করা হচ্ছে। ৯ই এপ্রিল বুধবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চুয়াডাঙ্গা কলেজ মাঠে বিশাল জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণ দেবেন। মাইকের ভাষাগুলো শুনে হৃদয়ে পুলকিত সৃষ্টি হয়। যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সমগ্র বাঙালি জাতি
মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিল। দীর্ঘ ন' মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অামরা অামাদের স্বাধীনতা অর্জন করি। সেই স্বাধীন দেশের মহা নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চুয়াডাঙ্গাতে অাসছেন। ভাবতে অবাক হয়ে যাই। এবার তাহলে প্রথম বারের মত
বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পারবো।
         তখন চুয়াডাঙ্গা একাডেমীতে পড়াশুনা করতাম। ঐ সময়.মনের ভেতরে চরম অাবেগ সৃষ্টি হয়। স্কুল থেকে পালায়। বাড়িতে এসে বাবাকে সব কথা বলি। বাবা!  বঙ্গবন্ধু  চুয়াডাঙ্গাতে অাসছেন। তুমি জানো বাবা? --- হ্যাঁ জানি । তুমি যাবে?----- হ্যাঁ, বাবা অামি যাবো।
          হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাহলে অনুমতি মিললো। অাজ সাত তারিখ। অার একটা দিন পর। স্বপ্নের রাজাকে দেখতে পারবো। সমস্ত হৃদয় জুড়ে অানন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।  
   দুপুর পেরিয়ে, বিকেল। অার বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা পর রাত এলো। কিন্তু কিছুতেই ঘুম অাসছে না। মন ছট ফট করছে অার একটা দিন কখন পার হবে। ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের ঘোরে সেই রাজ পুত্রের দেখতে পাই। তিনি অাসছেন বীরদর্পে।
     ------ভোরে পাখী ডাকছে। ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে পড়ি বিছানা ছেড়ে। বাড়ির ভেতর হাটা হাটি করি। এক সময় চোখে মুখে জল দিয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকি। কোন রকম নাস্তা সেরে পড়তে বসি। দশটা পার হতেই স্কুলে ছুটি। বিষয়টি নিয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলি। সাথে সাথে দু'জন রাজি হয়ে যায়। সকলের অগোচরে স্কুল ফাঁকি দিয়ে অামরা তিন জন কলেজ মাঠে হাজির হয় যেখানে : শ্রেষ্ঠ বাঙালি একাত্তরের মত গর্জে উঠবেন। বাড়ি ফিরে এসে অপেক্ষা করতে থাকি।
      রাত পেরিয়ে ফিরে এলো সেই কাঙ্খিত দিনটি। সকাল থেকে মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকে।  এক সময় শহর অচল হয়ে পড়ে।  মানুষ অার মানুষ। ৯ই এপ্রিল। বাবার হাত ধরে ধীর গতিতে কলেজ মাঠে যায়। মঞ্চের পাশে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকি বঙ্গবন্ধুর জন্য। সেই বিশাল মাঠটি মহাসমুদ্রে পরিনত হয়। যে দিকে তাঁকায় শুধু চোখে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মাথা অার মাথা। মাঠটিতে তিল মাত্র জায়গা নেই।কেউ গাছে উঠে, কেউবা ঘরের ছাদে উঠে এক নজরে বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য মানুষ যেন পাগল হয়ে গেছে। 
       হঠাৎ আকাশ  জুড়ে বিকট শব্দ। সবাই অাকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে হেলিক্যাপ্টার ঘুরছে। সমস্ত মাঠ জুড়ে শ্লোগানে শ্লোগানে উচ্চারিত হচ্ছে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। গায়ের লোম শিহরিত হচ্ছে। ফিরে এলো বুঝি সেই একাত্তর।
       হেলিক্যাপ্টার ঘুরতে ঘুরতে এক সময় টাউন ফুটবল মাঠে অবতরণ করে। সেখান থেকে গাড়ি যোগে সরাসরি কলেজ মাঠে হাজির হন বঙ্গবন্ধু । 
মঞ্চে উঠে অাসেন বীরের মত। চারিদিক ঘুরে ঘুরে হাত  নাড়তে থাকেন। এ সময় অামি হাত বাড়িয়ে দিই। বঙ্গবন্ধু হ্যান্ডসেফ করেন। অামি অবাক হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর মত বিশাল নেতার পক্ষে এটা সম্ভব। সব সময় এই দৃশ্যটি চেখে ভেসে ওঠে।  উচু লম্বা রাজপুত্র বীরের মত মঞ্চে বসেন।
       এ্যাডভোকেট ইউনুস অালির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন সোলাইমান হক জোঃ ছেলুন এম পি, ডাঃ অাশাবুল হক, ডাঃ নজির অাহমেদ, বারিস্টার বাদল রশিদ, মিসকিন মিয়া, দোস্ত মোহাম্মদ অানসারি,  অামির অালি, নুরে অালম সিদ্দিকী প্রমুখ। সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়ে দেন কেয়ামত অালি বিশ্বাস। এরপর উঠে দাড়ান সেই  বীর পুরুষ বঙ্গবন্ধু। 
         তিনি দরাজ কন্ঠে ভাষণে দিতে শুরু করেন-----। আমার  দু,এক লাইন মনে অাছে----। তিনি বলেন ছিলেন,  "মহান মুক্তিযুদ্ধে অাপনারা সম্মিলিত ভাবে অংশ নিয়ে যেমন ভবে আপনারা দেশকে স্বাধীন করেছেন, ঠিক তেমনি ভাবে অাপনারা সম্মিলিত ভাবে দেশ গড়ার কাজে অাত্মনিয়োগ করুন"। তিনি আবার হাত নেড়ে নেড়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভাষণ দেন। যখন ভাষণ শেষ করেন তখন সভাস্হলে হুড়োহুড়ি বেঁধে যায়। কে কার অাগে যাবে। তখন অামি বাবাকে হারিয়ে ফেলি বাবা অামাকে খুঁজছেন।  অার অামি বাবাকে খুঁজছি। বহু কষ্ট করে যখন বাড়িতে ফিরি  তখন বাবার দেখা পাই। বাবাকে তখন চরম বিমর্ষ লাগছিল। এক সময় বলেই ফেললাম
বাবা কেমন লাগলো রাজপুত্রের ভাষণ? বাবা বললেন, যার তুলনা নেই।

"তোমাকে দেখে মুগ্ধ হলাম
        পুলকিত হলো মন,
   অাজও তোমাকে ভুলতে পারিনি
         সারাদিন সারাক্ষণ"।

   এরপর রচিত হলো এক জঘন্য রক্তাক্ত কালো অধ্যায়। সেনাবাহিনীর  
কিছু বিপথগামী সদস্যরা হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অাগষ্ট গোটা পৃথিবীকে থমকে দেয়। বাঙালি জাতিকে হতবাক করে। সেদিন কোথায় ছিল মানবতা?  সেই দুঃখ, সেই শোক অার সেই বেদনা অাজও বহন করে বেড়াতে হয়। কিছু খুনিদের ফাঁসি হলেও এখন অনেকে
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের পৃষ্টপোষকতায় বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এটা কি ধরনের সভ্যটা? এই অসভ্য অাইনকে অামরা মানিনা। খুনি ও সন্ত্রাসীদের বিচার হতেই হবে। হত্যাকান্ডের কথা মনে হলেই বুকের ভেতর চরম কষ্ট লাগে। 

  "তোমাকে হারিয়ে কষ্ট লাগে
   অামরা যায়নি ভুলে,
   কষ্টের মাঝে বুকের ভেতর 
    তোমাকে রেখেছি তুলে "। 

    বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর পরই বঙ্গবন্ধু মঞ্চ টি ভেঙে ফেলা হয়েছে। জানিনা কার ইশারায় মঞ্চটি ভাঙা হয়? অধ্যক্ষের অফিসের পাশেই মঞ্চটি তৈরী করা হয়েছিল। মঞ্চটি পুনরায় নির্মান করে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাক এটাই কামনা করি।


চিত্তরঞ্জন সাহা
বড় বাজার, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ
 

Saturday, 17 April 2021

বেকারত্ব –অনীশ ব্যানার্জ্জী

 মুক্তগদ্য 


'চাকরি' এই তিন অক্ষরের একটা শব্দ যেন ত্রিভূবনের সব সুখ উজাড় করে দেয়। চাকরি পেলে অশিক্ষিত ব্যক্তিও যেন শিক্ষিত বেকারকে জ্ঞান দেবার ছাড়পত্র পেয়ে যায়। অসাধারণ বা উচ্চমেধাবীদের না হলে দেশ চলবে না তাই তাদের দুশ্চিন্তা নেই বেকারত্ব নিয়ে; নিম্ন মেধাবীদের সাধারনত কোন উচ্চাশা থাকেনা জীবনে, তারা যতটুকু পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। তারা লেখাপড়ায় এগোয়না বেশিদূর, অল্প বয়সেই রোজগারের পথ খুঁজে নেয়। সমস্যা এই মধ্যমেধাসম্পন্নদের নিয়ে, এক কথায় যারা মোটামুটি । তারা স্বপ্ন দেখে ভালোর মতো কিন্তু পারেনা, আবার নিম্ন মেধাসম্পন্নদের সাথেও হাত মেলাতে পারেনা, ছোট্ট কথায় বলতে গেলে ,

ভালো’ সবচেয়ে সুখী জীবনে, যা চেয়েছে পেয়েছে,

খারাপ’ ভাবে কী ভাগ্যি এইটুকু মোর  হয়েছে।

মোটামুটি’ এই দুইয়ের মাঝে কোনদিকে যে যায় ?

      স্বপ্ন তাহার ‘ভালো  হবার কিন্তু নাহি হয়।

 

অঞ্জন দত্ত আর বেলা বোসের কাহিনী আমরা সবাই জানি, বাস্তবটাও তাই কোন বেলা বোসই চেষ্টা করেনা নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অঞ্জন দত্তের মতো বেকারদের পাশে দাঁড়াতে। এতো গেল প্রেমের কথা, প্রেম সবার জীবনে আসেনা । এবার আসি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা যা আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হল আমাদের পরিবার। ছেলে বেকার বা চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, বয়স বেড়ে যাচ্ছে, এমন সময় বেশিরভাগ পরিবারের মানুষেরও আচরন যেন বদলে যায়।  ড. এ.পি.জে আবদুল  কালাম তার পরিবারকে 'স্ট্রং রুটস' বলে অভিহিত করেছেন, তিনি একথাও বলেছেন “যতদিন মানুষ চাকরির জন্য পড়াশোনা করবে ততদিন শুধু চাকরই জন্মাবে”। তিনি মানুষরূপি ঈশ্বর তার কথা হয়ত সত্যি কিন্তু বাস্তবে অনেকক্ষেত্রেই মেলেনা, কারন সবাই কালাম হয়না।  বেকারদের পাশে সবসময় পরিবার পাশে থাকেনা আর রোজগার করতে না পারলে যেন পড়াশোনা যেন অর্থহীন। পুরুষকে সর্বদাই রোজগেরে হতে হয় বিশেষ করে দরিদ্র আর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মালে।  সাধারনত কয়েকটি পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বেকার যুবকদের যে অপমান বা তেতো কথা হজম করতে হয় তার কয়েকটি নজির আমি নিম্নে তুলে ধরলাম,

 

 

.বেকার ছেলে অন্যকে ভালো বললে,

 অভিভাবক-: তোর কাছে কি আমরা ছাড়া সবাই ভালো?

২.বেকার ছেলে অন্যকে খারাপ বললে,

অভিভাবক-: ভালো কে ভালো বলতে শেখ অন্তত, নিজে হতে পারিস না পারিস।

৩.বেকার ছেলে ভালো জানে এইরকম কোনও বিষয়ে কিছু বললে,

অভিভাবক-: তুই কী সব জানিস? এত জ্ঞান যখন  তাহলে ঘরে বসে কেন ?

৪.বেকার ছেলে জানেনা এইরকম বিষয়ে  “ঠিক জানিনা” বলে চুপ করে বসে থাকলে,

 অভিভাবক-: কিছুই তো জানিসনা কী আর হবে ?; কুয়োর ব্যাঙ হয়ে ঘরেই বসে থাক।

৫.বেকার ছেলে টাকা চাইলে হয়ত টাকা দেন অভিভাবকরা কিন্তু সেই দেয়া কেমন একজন বেকারই বোঝে, আবার কখনও দেননা।

৬.বেকার ছেলে প্রতিবাদ করলে,

অভিভাবক-:আমরা তো যা চাইছিস তাই দিচ্ছি তারপরেও এইরকম বলছিস। (গায়ে বেইমানের তকমা লেগে যাবে)

৭.বেকার ছেলের অভিভাবকদের কাছে পাশের বাড়ি থেকে আত্মীয় স্বজন সবার ছেলে ভালো, নিজেরটাই বেকার। যারা পড়ছে সবাই চাকরি পাবে, যারা চাকরি করছে তারাও ভালো। শুধু তার ছেলেই কিছু পাবেনা, তারটাই দুনিয়ার সব থেকে অপদার্থ।

৮.বেকার ছেলে অন্যের আনন্দের সাথে নিজের  আনন্দ ভাগ করে নিয়ে মেতে উঠলে,

অভিভাবক-: ওর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবি ত? ও এর তুই এক?

৯.বেকার ছেলে অন্যের আনন্দে কর্ণপাত না করলে,

 অভিভাবক-: কী রে? এখানে? ওদিকে অমুক চলছে। তুই কী অন্যের ভালো এতটুকু দেখতে পারিস না?

১০.বেকার ছেলে যখন একটা সাধ মেটানোর আবদার নিয়ে আসে বাবা মার কাছে,

অভিভাবক-: তুই ছাড়া আর কেউ করছে? ত্রিভুবন দেখাতে পারবি?

       এক. একটা ভালো ছেলেকে উদাহরণ দিলে,

অভিভাবক-: কার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করছিস জানিস? একবার ভাব ওর নখের যোগ্য তুই?

       দুই. একটা খারাপ কাউকে উদাহরণ দিলে,

অভিভাবক-: নজর কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছিস। ঠিকই আছে নজর ঐদিকে বলেই তো বেকার হয়ে বসে আছিস।

      তিন. একটা সমমানের কাউকে উদাহরণ দিলে,

অভিভাবক-: ও করল বলে তকেও করতে হবে? নিজস্বতা নেই ? অনুকরন প্রিয় ছেলে কোথাকার।

১১.বেকার ছেলে  যখন সংসারে কোনো কাজ না করে,

 অভিভাবক -: চাকরি করতে না পারিস ঘরের কাজে তো একটু হাত লাগাতে পারিস।

১২.বেকার ছেলে যখন সংসারে কোন কাজ সুন্দর করে নিবেদন করে

অভিভাবক-: ছেলেটা ঘরকুনো হয়ে গেল, আর বেড়িয়ে চাকরি করতে পারবে না।

 

 উপসংহার-: একদিন ছেলে চাকরি পায়, না পেলেও দুনিয়ায় একটা কাজ খুঁজে নেয়। তখন এইরূপ আচরনের আচরনের প্রতিদান আসে, কেমন হবে তা আপনিই বলুন।

আর সবদোষ ? ছেলের বউএর ঘাড়ে গুঁজে দেবেন অভিভাবকগন।  সকলে সেটা বিশ্বাসও করবে। কেউ ভিতরের খবর নেয়না, ভিতরটা দেখেনা। আর কেউ চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার পথকে বেছে নেয় আর তখন লোকে বলে আত্মহত্যার আগে বাবা মায়ের মুখটা একবার মনে পড়ে না এদের? আত্মহত্যা করা অবশ্যই অন্যায় আমি স্বীকার করছি কিন্তু পরিবারের আচরনই যদি  একজনকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয় তখন কেন তাদের কথা মনে পড়বে মরার পূর্বে?


অনীশ ব্যানার্জ্জী ( পূর্ব বর্ধমান )


করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...