মুক্তগদ্য
তখন একটু বেড়ে উঠেছি। নবম শ্রেনীর ছাত্র। সম্ভবত ১৯৭৩ সাল। সারা শহর জুড়ে ব্যাপক মাইকিং করা হচ্ছে। ৯ই এপ্রিল বুধবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চুয়াডাঙ্গা কলেজ মাঠে বিশাল জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণ দেবেন। মাইকের ভাষাগুলো শুনে হৃদয়ে পুলকিত সৃষ্টি হয়। যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সমগ্র বাঙালি জাতি
মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিল। দীর্ঘ ন' মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অামরা অামাদের স্বাধীনতা অর্জন করি। সেই স্বাধীন দেশের মহা নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চুয়াডাঙ্গাতে অাসছেন। ভাবতে অবাক হয়ে যাই। এবার তাহলে প্রথম বারের মত
বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পারবো।
তখন চুয়াডাঙ্গা একাডেমীতে পড়াশুনা করতাম। ঐ সময়.মনের ভেতরে চরম অাবেগ সৃষ্টি হয়। স্কুল থেকে পালায়। বাড়িতে এসে বাবাকে সব কথা বলি। বাবা! বঙ্গবন্ধু চুয়াডাঙ্গাতে অাসছেন। তুমি জানো বাবা? --- হ্যাঁ জানি । তুমি যাবে?----- হ্যাঁ, বাবা অামি যাবো।
হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাহলে অনুমতি মিললো। অাজ সাত তারিখ। অার একটা দিন পর। স্বপ্নের রাজাকে দেখতে পারবো। সমস্ত হৃদয় জুড়ে অানন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।
দুপুর পেরিয়ে, বিকেল। অার বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা পর রাত এলো। কিন্তু কিছুতেই ঘুম অাসছে না। মন ছট ফট করছে অার একটা দিন কখন পার হবে। ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের ঘোরে সেই রাজ পুত্রের দেখতে পাই। তিনি অাসছেন বীরদর্পে।
------ভোরে পাখী ডাকছে। ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে পড়ি বিছানা ছেড়ে। বাড়ির ভেতর হাটা হাটি করি। এক সময় চোখে মুখে জল দিয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকি। কোন রকম নাস্তা সেরে পড়তে বসি। দশটা পার হতেই স্কুলে ছুটি। বিষয়টি নিয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলি। সাথে সাথে দু'জন রাজি হয়ে যায়। সকলের অগোচরে স্কুল ফাঁকি দিয়ে অামরা তিন জন কলেজ মাঠে হাজির হয় যেখানে : শ্রেষ্ঠ বাঙালি একাত্তরের মত গর্জে উঠবেন। বাড়ি ফিরে এসে অপেক্ষা করতে থাকি।
রাত পেরিয়ে ফিরে এলো সেই কাঙ্খিত দিনটি। সকাল থেকে মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। এক সময় শহর অচল হয়ে পড়ে। মানুষ অার মানুষ। ৯ই এপ্রিল। বাবার হাত ধরে ধীর গতিতে কলেজ মাঠে যায়। মঞ্চের পাশে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকি বঙ্গবন্ধুর জন্য। সেই বিশাল মাঠটি মহাসমুদ্রে পরিনত হয়। যে দিকে তাঁকায় শুধু চোখে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মাথা অার মাথা। মাঠটিতে তিল মাত্র জায়গা নেই।কেউ গাছে উঠে, কেউবা ঘরের ছাদে উঠে এক নজরে বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য মানুষ যেন পাগল হয়ে গেছে।
হঠাৎ আকাশ জুড়ে বিকট শব্দ। সবাই অাকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে হেলিক্যাপ্টার ঘুরছে। সমস্ত মাঠ জুড়ে শ্লোগানে শ্লোগানে উচ্চারিত হচ্ছে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। গায়ের লোম শিহরিত হচ্ছে। ফিরে এলো বুঝি সেই একাত্তর।
হেলিক্যাপ্টার ঘুরতে ঘুরতে এক সময় টাউন ফুটবল মাঠে অবতরণ করে। সেখান থেকে গাড়ি যোগে সরাসরি কলেজ মাঠে হাজির হন বঙ্গবন্ধু ।
মঞ্চে উঠে অাসেন বীরের মত। চারিদিক ঘুরে ঘুরে হাত নাড়তে থাকেন। এ সময় অামি হাত বাড়িয়ে দিই। বঙ্গবন্ধু হ্যান্ডসেফ করেন। অামি অবাক হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর মত বিশাল নেতার পক্ষে এটা সম্ভব। সব সময় এই দৃশ্যটি চেখে ভেসে ওঠে। উচু লম্বা রাজপুত্র বীরের মত মঞ্চে বসেন।
এ্যাডভোকেট ইউনুস অালির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন সোলাইমান হক জোঃ ছেলুন এম পি, ডাঃ অাশাবুল হক, ডাঃ নজির অাহমেদ, বারিস্টার বাদল রশিদ, মিসকিন মিয়া, দোস্ত মোহাম্মদ অানসারি, অামির অালি, নুরে অালম সিদ্দিকী প্রমুখ। সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়ে দেন কেয়ামত অালি বিশ্বাস। এরপর উঠে দাড়ান সেই বীর পুরুষ বঙ্গবন্ধু।
তিনি দরাজ কন্ঠে ভাষণে দিতে শুরু করেন-----। আমার দু,এক লাইন মনে অাছে----। তিনি বলেন ছিলেন, "মহান মুক্তিযুদ্ধে অাপনারা সম্মিলিত ভাবে অংশ নিয়ে যেমন ভবে আপনারা দেশকে স্বাধীন করেছেন, ঠিক তেমনি ভাবে অাপনারা সম্মিলিত ভাবে দেশ গড়ার কাজে অাত্মনিয়োগ করুন"। তিনি আবার হাত নেড়ে নেড়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভাষণ দেন। যখন ভাষণ শেষ করেন তখন সভাস্হলে হুড়োহুড়ি বেঁধে যায়। কে কার অাগে যাবে। তখন অামি বাবাকে হারিয়ে ফেলি বাবা অামাকে খুঁজছেন। অার অামি বাবাকে খুঁজছি। বহু কষ্ট করে যখন বাড়িতে ফিরি তখন বাবার দেখা পাই। বাবাকে তখন চরম বিমর্ষ লাগছিল। এক সময় বলেই ফেললাম
বাবা কেমন লাগলো রাজপুত্রের ভাষণ? বাবা বললেন, যার তুলনা নেই।
"তোমাকে দেখে মুগ্ধ হলাম
পুলকিত হলো মন,
অাজও তোমাকে ভুলতে পারিনি
সারাদিন সারাক্ষণ"।
এরপর রচিত হলো এক জঘন্য রক্তাক্ত কালো অধ্যায়। সেনাবাহিনীর
কিছু বিপথগামী সদস্যরা হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অাগষ্ট গোটা পৃথিবীকে থমকে দেয়। বাঙালি জাতিকে হতবাক করে। সেদিন কোথায় ছিল মানবতা? সেই দুঃখ, সেই শোক অার সেই বেদনা অাজও বহন করে বেড়াতে হয়। কিছু খুনিদের ফাঁসি হলেও এখন অনেকে
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের পৃষ্টপোষকতায় বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এটা কি ধরনের সভ্যটা? এই অসভ্য অাইনকে অামরা মানিনা। খুনি ও সন্ত্রাসীদের বিচার হতেই হবে। হত্যাকান্ডের কথা মনে হলেই বুকের ভেতর চরম কষ্ট লাগে।
"তোমাকে হারিয়ে কষ্ট লাগে
অামরা যায়নি ভুলে,
কষ্টের মাঝে বুকের ভেতর
তোমাকে রেখেছি তুলে "।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর পরই বঙ্গবন্ধু মঞ্চ টি ভেঙে ফেলা হয়েছে। জানিনা কার ইশারায় মঞ্চটি ভাঙা হয়? অধ্যক্ষের অফিসের পাশেই মঞ্চটি তৈরী করা হয়েছিল। মঞ্চটি পুনরায় নির্মান করে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাক এটাই কামনা করি।
চিত্তরঞ্জন সাহা
বড় বাজার, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ
বড় বাজার, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ
No comments:
Post a Comment