Saturday, 24 April 2021

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

 

মুক্তগদ্য 


'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম 

মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল ,

মোরা বিধাতার মত নির্ভয় 

মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।'


- কবি কাজী নজরুল ইসলাম 


বড্ড   ছোট  বেলাটা মনে পরে আজ এই অতিমারীর  দিন'এ ।আর যতোই মনে পরে ততই মনে মনে তুলনা করে ফেলছি 2020/2021 র হতোভাগ্য বাচ্চা গুলোর  সাথে । এই COVID যদি  সব চেয়ে বেশি কারুর ক্ষতি  করে থাকে তো  সে হলো  ছোটদের । এই  নিয়ে  দ্বিতীয় বছর  হলো ছোট ছোট বাচ্চাদের স্কুল'এর দরজা বন্ধ ।

কোনো উপায়ে  নেই  যে  খুলবে  ।করোনা  তার থাবা দ্বিতীয় বারের জন্য আবার প্রসারিত করে ফেলেছে ।তাই বাচ্চা গুলো আজ আবার ঘর বন্দি ।যে ভিডিও গেম খেলা আর  টিভি দেখা থেকে আগে বড়োরা বাচ্চাদের  দূর'এ রাখতে চাইতো , আজ ওদের দিন কাটানোর সব  চেয়ে বড় সঙ্গী সেগুলোই হয়ে উঠেছে ।সারাক্ষন অনলাইন ক্লাস করে  খুদেরা এমনিতেই হাঁপিয়ে  উঠেছে ।

কিন্ত তারপরেও তো সেই ঘরে বসে থাকা ।হোম কোয়ারেন্টাইন ব্যাপারটা যে কি সেটা বোঝা একটা ছোট শিশুর পক্ষে খুবই কঠিন |আর বাবা মার অতি ব্যস্ত জীবনে কতটুকুই বা সময় দেওয়া  সম্ভব ও'দের ।তাই অনেকেই অধৈর্য হয়ে উঠেছে । বড়োদের  সাথে সাথে বাচ্চাদের  মেন্টাল স্ট্রেস ভীষণ ভাবে বাড়ছে ।ওদের ওপর  রাগ করার জায়গা কিন্ত বড়োদের আর নেই ।বন্ধুদের সাথে খেলার  উপায় নেই ,স্কুল যাওয়া নেই , ক্রিকেট/ ফুটবল এর মতো  কোনো টিম গেম খেলার  উপায় নেই ।বলুন তো ওরা কোথায় যাবে আর কি করবে সারাটা দিন ! তাই পেরেন্টস কে ইন্ডোর গেমস খেলায় বা নাচে,গানে,গল্পে  ওদের সঙ্গ দিতে হবে | বিশেষত যারা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি আর ছেলে  বা মেয়েটির  দ্বিতীয় সঙ্গী নেই ।ইন্টারনেট ঘেঁটে বাচ্চাটি কি দেখছে সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি আর কারণটা নিশ্চই সবারই জানা ।সাইবার ক্রাইমও দিন দিনই বেড়েই চলেছে |তাই সন্তানকে আরো বেশি করে বুঝতে হবে এই কঠিন পরিস্থিতে ।ধৈর্য ধরে ওদের রাগ অভিমান শুনতে হবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও ।কোনো ভাবেই যাতে মেন্টালি কোনো বাচ্চা  ডিপ্রেশন এ না চলে যায় ,এটাই কাম্য ।স্বপ্ন দেখি খুব তাড়াতাড়ি আমরা এই অতিমারীকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়াই আর আবার  আগের মতো খুদেরা নিজেদের শৈশব উপভোগ করার সুযোগ টুকুনি পাক ।পৃথিবী আবার ছোটদের কোলাহল  আর নিষ্পাপ  হাসি'তে মুখরিত হয়ে উঠুক !


বিশাখা ব্যানার্জী পতি




Friday, 23 April 2021

উপন্যাস নয় ১ - আবির মুখোপাধ্যায়

 




মুক্তগদ্য


জীবনের এই যে এত বাঁকবদল, প্রতিটির মুখেই তো মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল, আশা করেছিলাম আপনি আমার এই দুঃস্বপ্নের দিনগুলি সরিয়ে ও সারিয়ে দিতে আসবেন, কোনো এক হঠাৎ রোববার! 

আমার সামান্য ঘরে মলিন ও ধূসর পর্দাগুলি সরিয়ে সূর্যের প্রথম আলো উপহার দেবেন বহু দীর্ঘ বিনিদ্র রাতের পর! 


রক্তচাপের দিনে, আপনি আসেননি। এসেছেন বলতে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, এসেছে বলতে আমার মনোচিকিৎসক বন্ধুটি! 


নিজের কাছে অস্বীকার করতে পারি না এই চন্দ্রভুক অমাবস্যার দীর্ঘ কালো রাত, বদ্ধ ঘরে ঘুরতে থাকা ভারী শীতল বাতাস আর ধূসর পর্দাগুলি আমায় বিব্রত করেছে, যথেচ্ছ! ভেতর ভেতর অজস্র সেতু ভেঙে পড়তে দেখে আমিও ভয় পেয়েছি কিঞ্চিত! 

একদিন উপলব্ধি করলাম, ভেঙে পড়তে চাওয়া মানুষের এক সহজ প্রবণতা, আর ভেঙে পড়তে পারা এক দুর্লভ প্রাপ্তি! 


তবুও, সকালে বুক চিতিয়ে বলেছি, আমার নির্মোহতা ও প্রতাশাহীনতার কথা। বলেছি, একা একা জিতে নেবার আশ্চর্য প্রতিজ্ঞার কথা! এসব বলার পরেও কিছু বলতে চাওয়া থাকে। বলতে না পারা থাকে৷ এই বলতে চাওয়া অথচ না পারার উপর জমা হয় বিন্দু বিন্দু অভিমান৷ 


বিন্দুতে সিন্ধু হয় কী না জানি না, তবুও বিন্দু বিন্দু অভিমান জমে কোনো এক রবিবার, দুপুর থেকে জোর বৃষ্টি হয়! 

মা বলে ঈশাণ কোনে মেঘ জমেছিল প্রচুর! 

মানুষের ঈশানকোণ কোনদিকে? আমি ঠিক জানি না!


আবির  মুখোপাধ্যায় 



Wednesday, 21 April 2021

স্নায়ুতন্ত্রে ( মুক্তগদ্য ) - মধুমিতা মৈত্র লাহিড়ী

 মুক্তগদ্য


বীজ ,মাটি , জল, বায়ু একত্রিত হয়ে নিখাদ সুতোর বিনুনিতে বেড়ে ওঠে একটি সরস রসালো সংবেদনশীল শরীর। গোড়া থেকে যার
আগা অবদি প্রতিটি রোমকুপে অনু পরমানুতে বয়ে চলে জীবন।চামড়া অস্থি প্রতিটি অংশে কথা হর্ষ কখনো বিষন্নতা। মহিরূহ জানান দেয়
কখোন সে বালিকা আবার কখোন সে যুবতী নাকি যুবক। অন্যথায় কখোন সে বাল্যাবস্থায় রয়েছে ,আবার কখোন যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে
পৌঁছালো। ঠিক একটি নিটোল মানুষ এই একেক টি গাছ।
       ....শিশুর মতো  নিরবিচ্ছিন্ন সরল ভোরবেলা আসে , ছলছল কলকল করে কতো
পাখি এসে বসে প্রতিটি পাতা ছুঁয়ে যায় তাদের
আদোর। আদোর খেতে খেতে কখোন সূর্যদেব
মাথার উপর দৃঢ হতে থাকে তা অজানাই থাকে।
গাছ যেন ভুলে যায় হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হয়, যেমন
করে শিশু বাল্যকাল ছাড়িয়ে শারীরিক পরিবর্তন দেখে  কদাচিত থমকে যায়।
                এর পর আসে বড় একখানা দুপুর যখন এই মহিরূহ না জানি কর্মজীবন টা বিস্তারিত করে - কিন্ত সেভাবে নাম পায়না।
পথিক আশ্রয় নেয় ছায়ায় আবার যখন চলে যায় তখন গাছের সারি দেখে মোনে লোভ জাগে, যদি কুঠারের আঘাতে কিছু বনরাজি
কাটা যেত তবে ধনের বেশ আগম হতো। আসতে হবে কোন দিন বিশেষ প্রস্ততি নিয়ে।

রাত  গাঢ হয় যখন স্নায়ুতন্ত্রে চলে অন্য হিল্লোল,
পা থেকে মগজ অবদি ঠিক মানুষের মতো এঁরাও রোমাঞ্চিত হতে থাকে। জগৎ সংসারের আড়ালে এক অন্য পৃথিবী অন্য এক বৃন্দাবন
তৈরী হয় সেখানে। চাঁদের আলোতে মহিরূহ সারি কি স্পষ্ট কি দীপ্ত।সনসন করে বাতাস বয়ে
যায় ,গাছ  গুলির  উপর যেন বাঁশি বাজিয়ে দেয়। তারা আনন্দ প্রকাশ করে অঙ্গীকার করে
অন্য এক পৃথিবীর। যেখানে কুঠার নেই , নেই
কোন স্বার্থপর কাঠুরিয়া, শুধুই পাখির কলকাকলি  বাতাসের ঢেউ আর ঘন সবুজ বনরাজি। যেখানে গাছের শিকড় বাকল আর
অস্থিসম ডালপালা নির্ভয়,  শিশুর মতো মাটির
জঠরে  পৌঁছে দেবে মুক্ত স্নায়ু স্রোত।


মধুমিতা মৈত্র লাহিড়ী


Tuesday, 20 April 2021

অনামী সম্পর্ক - নন্দিনী সাহা

 

মুক্তগদ্য

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে কোন না কোন সময় এমন একজন মানুষ এসেছে বা আসে,তাদের সাথে না চাইতেই হয়তো আমরা জড়িয়ে পড়ি,আঁকড়ে ধরতে চাই,রাতের পর রাত জেগে গল্প করি,অপেক্ষা করি কথা বলার জন্য,কিংবা একটিবার তার আওয়াজ শোনার জন্য ছটফট করি,জাস্ট ভীষণ ভাবে জড়িয়ে পড়ি।

অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করে..
আবার ভালোবাসতে ইচ্ছে করে,অপেক্ষা করতে ভালো লাগে,সাজতে ইচ্ছে করে,চোখে কাজলটা আরেকটু গাঢ় করে পড়তে ইচ্ছে করে,নিজেকে সাজাতে ইচ্ছে,তার পছন্দের রঙের শাড়ী কিংবা কুর্তিতে নিজেকে বারবার আয়নাতে জরিপ করতে ইচ্ছে হয়,কেমন লাগছে নিজেকে,কী বলবে সে আমাকে,যখন আমাকে দেখবে!
এমন অনেক ভাবনার খেয়ায় আমরা ভাসতে থাকি।

অানমনেই অন্যকে ডাকতে গিয়ে তার নাম নিয়ে ফেললে পরক্ষণেই জিভ কেটে নিজের মাথায় দুটো চাটি মেরে 'ধ্যাৎ কী যে আমার হলো' বলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠি।

ইচ্ছে করে জ্বরও বাঁধিয়ে ফেলি কখনো,কেবল তার থেকে আদুরে বকুনি শুনবো বলে।

হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষগুলিও আবার হাসতে শেখে।চোখদুটিই জানান দেয় ভেতরের খুশির খবর।

দেখা হলে শরীর ছোঁয়ার চাওয়া থাকে না,কেবল ভালোলাগার চাহনি থাকে,অনামিকা কনিষ্ঠায় আদুরে আলাপ থাকে।কিংবা কোনো একটা বিকেল,তার নামে লিখে দিতে ইচ্ছে করে।শুধু তার কথা শুনবো বলে,কাছ থেকে দেখবো বলে,এর বেশি আর কিছু চাওয়া থাকে না, চাহিদা থাকে না।

যোগাযোগ ছিন্ন হলেও কাদা ছেঁটায় না ওরা,থেকে যায় ওরা ডায়েরীর পাতার লুকোনো প্রথম প্রেমে পাওয়া শুকিয়ে যাওয়া অবিচ্ছেদ্য গোলাপের মতো।
সেই গোলাপে কোনো গন্ধ থাকে না,কিন্তু স্পর্শ করলে সেই আদুরে আলাপের দিনগুলো দৃষ্টিপটে ভেসে ওঠে,যা মনকেমনের দিনগুলোতে জড়িয়ে রাখে ভালোলাগার আবেশে,ঠিক মায়ের হাতে বোনা নকশিকাঁথার মতো।

কিছু সম্পর্ক শুরু হয়,কিন্তু নাম পায় না,সামাজিক পরিচিতি পায় না।তবুও অনামী হয়েও,ভীষণ দামী হয়ে রয়ে যায়।কী তাই না?


নন্দিনী সাহা


পুস্তক পর্যালোচনা - গোবিন্দ মোদক

 

পুস্তক: স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু।
সম্পাদক: সুদেষ্ণা চক্রবর্তী।
প্রকাশক: শরৎশশী,  হাওড়া।
পর্যালোচক: গোবিন্দ মোদক।


            করোনা আবহে বিশেষভাবে অবকাশ পাবার দরুণ কবি-লেখক-শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতাকে আরও বিকশিত করবার সুযোগ পেয়েছেন --- প্রকাশিত হয়েছে অজস্র কবিতার বই, ছড়াগ্রন্থ, অণুগল্প সংকলন, গল্পগ্রন্থ ইত্যাদি ; তবে ভিন্নধর্মী গদ্যগ্রন্থ তথা অনুপ্রেরণামূলক গ্রন্থের সংখ্যা যথেষ্টই নগণ্য --- তবু তারই মধ্যে সুলেখিকা সুদেষ্ণা চক্রবর্তী সম্পাদিত 172 পৃষ্ঠার "স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু" গ্রন্থটি তার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম যেখানে প্রকৃত অর্থেই ছিন্নমূল একজন সাধারণ নারীর জীবন সংগ্রাম ও মহিয়সীতে উত্তরণের ঘটনাগুলিকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে এক ভিন্নধর্মী জীবনালেখ্য তথা সংগ্রামের কাহিনী, যা আরও আরও বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষকে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, স্বাবলম্বী হয়ে উঠবার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আসুন, "তমসো মা জ্যোতির্গময়" -- এই উপনিষদবাণীকে স্মরণ করে গ্রন্থটির অন্দরমহলে একটু উঁকিঝুঁকি দিতে চেষ্টা করি।

           যদিও শ্রীমতি মঞ্জু দাস (১৯৫২-২০১৯) তেমন স্বনামধন্যা কোনও মহিয়সী রমণী নন যাঁকে নিয়ে খবরের কাগজে কলম লেখা হয়েছে বা দূরদর্শনে তা  সম্প্রচারিত হয়েছে --- তথাপি তিনি সেই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের একজন যিনি স্বজনহারা হয়ে মাত্র তিন বছর বয়সে উদ্বাস্তু হয়ে এপার বাংলায় এসে বিভিন্ন অনাথ আশ্রমের নিপীড়িত, কুয়াশাচ্ছন্ন জীবনের অনিশ্চয়তাকে জয় করে 'সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্' এর পথ ধরে আজীবন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন --- অসংখ্য শিশু-কিশোর মনে জ্ঞানের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত করে গেছেন। সমস্ত প্রতিকূলতাকে অসীম মানসিক শক্তিতে অতিক্রম করে নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিচল ভাবে এগিয়ে গেছেন। হয়তো আক্ষরিক অর্থে তিনি খ্যাতির সেই শীর্ষে পৌঁছুতে পারেননি, কিন্তু অখ্যাতির শেষ ধাপ থেকে উঠে এসেছেন নিরন্তর সংগ্রামের পথ অবলম্বন করে --- এবং এভাবে তাঁর সেবা, সততা আর সু-কর্ম দিয়ে খুব সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক বিদগ্ধ মানুষজনের স্মরণে-মননে স্থান করে নিয়েছেন।

             কিন্তু তার এই যাত্রাপথ সর্বদা মসৃণ বা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না --- এক মুঠো ভাত পাবার আশায় অনাথ আশ্রমে তাঁকে যেমন রান্নার ঠাকুর ও জোগাড়ে মাসিদের গাদা গাদা জামা-কাপড় কেচে দিতে হয়েছে, তেমনই পরবর্তীতে অর্থাভাবে বিভিন্ন বাড়ির বাচ্চাদের পড়িয়ে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে নিজেকে স্নাতক স্তরে উন্নীত করেছেন, বেসিক শিক্ষকতার ট্রেনিং কোর্সে ডিপ্লোমা করেছেন। এভাবে লক্ষ্য স্থির রেখে অদম্য মনোবল পাথেয় করে পৌঁছাতে পেরেছেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে --- নিজেকে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছেন শিক্ষকতায়, মানুষের সেবায়, সাহিত্যচর্চায় ও পত্রিকা সম্পাদনায়।

             শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা মা ও বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে দীক্ষিত মঞ্জুদেবী ছিলেন মানুষের সেবাধর্মে নিবেদিতপ্রাণা। তাই তো তাঁর এই সু-কৃতি মানুষের মনের পাতায় এতোটাই ছাপ রেখেছে যে শতাধিক বিদগ্ধ ব্যক্তি (অধ্যাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, কবি, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী, প্রতিবেশী এবং সাধারন মানুষ) তাঁর এই কর্মময় জীবনকে কুর্নিশ জানিয়ে শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় স্মরণ করেছেন .... যার সারাংশ বিধৃত হয়েছে "স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু" শীর্ষক সংকলন গ্রন্থটির মর্মর পাতায় পাতায়। আশা করা যেতেই পারে যে তাঁর জীবন সংগ্রাম এবং উত্তরণের এই অধ্যায় অনেক হেরে যাওয়া অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। আর ঠিক সেইখানেই গ্রন্থটির সার্থকতা।

             গ্রন্থটির উপরি পাওনা হলো মঞ্জুদেবীর বেশ কিছু আলোকচিত্রসহ তাঁর সাহিত্যচর্চার বেশ কিছু উৎকৃষ্ট নিদর্শন যা গ্রন্থটিতে মান্যতার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে । ঝকঝকে নির্ভুল ছাপা, উৎকৃষ্ট কাগজ, মজবুত বাঁধাই এবং মালটিকালার ল্যামিনেটেড প্রচ্ছদ বইটিকে প্রকৃত অর্থেই দৃষ্টিনন্দন করেছে এবং বইটির গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বইটির প্রকাশক হলেন শরৎশশী, অবিনাশ ব্যানার্জি লেন, হাওড়া- ৭১১১০৪ ( মুঠোফোন:  ৯৪৩২১০৯৯১৭) এবং প্রাপ্তিস্থান পাতাবাহার, কলেজ স্কোয়ার ইস্ট, কলকাতা-৭৩, স্টল নম্বর দশ-এগারো। এছাড়াও ধ্যানবিন্দু (স্টল নম্বর পাঁচ-ছয়) এবং অন্যান্য পরিবেশকের কাছে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। বইটির মূল্য মাত্র দেড়শো টাকা। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।


পুস্তক: স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু


‘বাংলার সংস্কৃতি’ - শ্রীমন্ত সেন

 

                                  প্রবন্ধ


সংস্কৃতির ইংরাজি হল ‘কালচার’ অর্থাৎ কর্ষণ বা কৃষ্টি। রামপ্রসাদের আক্ষেপ, “এমন মানব-জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।” বাঙালির জীবন-জমিনে অবশ্য সোনার ফসলের অনুপপত্তি নেই। সে যে কোনও দিকেই হোক না কেন— অর্থাৎ ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, পালপার্বণ, শুভ উৎসব, যাত্রা-নাটক, চিত্রকলা, দর্শন, বিজ্ঞান, জীবনশৈলী, জীবনভাবনা, কিংবদন্তী, পুরাণ, পরিমণ্ডল-- সকল ক্ষেত্রেই

        সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি প্রথমে ভারতীয়, তারপর হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক ইত্যাদি। তারপর বাঙাল-ঘটী— তারও পর নাগরিক ও গ্রামীণ ইত্যাদি। প্রথমে বাহ্মণ্যধর্মের তেজোমহিমা, ক্ষীয়মাণ গৌরবের মধ্য থেকে উৎসারিত স্বার্থপরতা, নীচতা, ভেদাভেদ-জ্ঞান, পরধর্ম-অসহিষ্ণুতা। তারপর বৈষ্ণবধর্মের প্লাবনে বাঙালির আত্মনিমজ্জন— কবির কথায়, “বড় বৃষ্টি হয়ে গেছে ‘চৈতন্যের’ বাঙালি জমিতে, কর্দমে মেলে না পাদপীঠ”

        বাঙালির মানস-ভুবনে শাশ্বত ধর্মের মহাজ্ঞান, চিদানন্দময়ী শক্তির প্রকাশ, বৈষ্ণবীয় ভক্তিপেলবতা, ব্রাহ্মধর্মের ‘একামেবাদ্বিতীয়ম্‌’-এর অভ্রংভেদী ‘ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য’ মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। তাই সেখানে ‘উদারচরিতানাং তু বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’। ফলস্বরূপ বাঙালি এক দিকে যেমন ‘বজ্রাদপি কঠোরাণি, মৃদুনি কুসুমাদপি’, তেমনই পৌত্তলিকতায় বিশ্বরূপদর্শী আবার অরূপরতনে স্বরূপপ্রিয়, তাই তারা অনায়াসে ‘প্রিয়রে দেবতা বানায়, দেবতারে প্রিয়’

        বাঙালির যেমন ঠাকুরমার ঝুলি, পঞ্চতন্ত্র, বর্ণপরিচয়, হাসিখুশি, বুড়ো-অ্যাংলা, ভূতপত্‌রীর দেশে, নালক, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণকথা, হযবরল, আবোল তাবোল, পাগলা দাশু আছে, ঠিক তেমনই আছে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ থেকে জীবনানন্দ, সমরেশদ্বয়, সুনীল, শীর্ষেন্দু, বিষ্ণু, শক্তি, নীরেন্দ্রনাথ, শঙ্খ প্রমুখ জীবনে জীবন যোগকারী প্রথিতযশা সাহিত্যকার। যেমন ডমরুচরিত, গোপালভাঁড়ীয় রসগল্প, রসময়ীর রসিকতা, ধূস্তরীমায়া, ভূশণ্ডির মাঠ, লালু, রসে বশে আছে, তেমনই আছে অব্যক্ত, লোটাকম্বল, দেবতাত্মা হিমালয়, কোথায় পাব তারে, সেই সময় ইত্যাদি। বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গ বাংলা সাহিত্যের এই রসবৈচিত্র্য মনে করিয়ে দেয় ‘রসো বৈ সঃ’

        বাঙালি না হলেও কালিদাসকে বাঙালি আত্মীয়করণ করে নেয় তাঁর বাগ্‌দেবীর কাছে প্রার্থনা ‘অরসিকেষু রসস্য নিবেদনং শিরসি মা লিখ, মা লিখ, মা লিখ’ সহ। বিদ্যাসাগরের প্রাণবন্ত বাংলায় কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌’-এর অংশবিশেষ অনুবাদে ‘শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা’ হয়ে ওঠে বাঙালি নববধূর চিরকালীন পতিগৃহ গমনের উজ্জ্বল উদ্ধার দৃষ্টান্ত।

        কাব্যের নৈবেদ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন দেবী সরস্বতীকে নন্দিত করেন, তেমনই নজরুল সঞ্চিতা, বিষের বাঁশি প্রভৃতি কাব্য দিয়ে অন্যায় অবিচার পরাধীনতার লৌহকপাট ভাঙতে চান, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছন্দ স্বাচ্ছন্দ্যে বন্দনা করেন ছন্দসরস্বতীর। সুনীলের কাব্য-প্রেয়সী নীরা হয়ে যায় সর্বজনীন দয়িতা, জীবনানন্দের বনলতা সেনও রূপান্তরিত হয় হাজার বছর ধরে কামনা করা এক রহস্যময়ী নারীতে। বিষ্ণু দের ‘স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যত’ হয়ে ওঠে বাঙালির স্মৃতি, সত্তা ও ভবিষ্যৎ।

        বাংলা সংস্কৃতির জীবনসরস্বতী হল বাংলা সঙ্গীত। যুগে যুগে সেই সঙ্গীত প্রবাহিনী বাঁক নিয়েছে নূতন থেকে নূতনতর দিকে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ভজন, টপ্পা, ধর্মসঙ্গীত, রামপ্রসাদী, কীর্তনাঙ্গের গান, রবিবাবুর গান, লোক সঙ্গীত, ভাটিয়ালি, জারি, ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, ঝুমুর, টুসু-ভাদুর গান, বাউল, দেহতত্ত্ব, আগমনী গান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদী, দ্বিজেন্দ্রগীতি, স্বর্ণযুগের গান সহ আধুনিক গান থেকে বর্তমানের তথাকথিত জীবনমুখী গান মায় ব্যান্ডের গান বাঙালির মানস-মৃত্তিকাকে করেছে রসসিক্ত, নন্দিত।

        তাই বাঙালি যেমন গাইতে পারে ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে / বসন্তের বাতাসটুকুর মতো’, তেমনই পারে হৈমন্তিক নিবেদন ‘ওগো যা পেয়েছি, সেইটুকুতেই খুশি আমার মন, কেন একলা বসে হিসাব কষে নিজেরে আর কাঁদাই অকারণ’ বা মান্না দের মন-কেমন-করা গান ‘বড় একা লাগে, এই আঁধারে মেঘের খেলায়, আকাশ পারে’-তে গলা মেলাতে। কিংবা হাল আমলের অনুপম বিনতি ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ বা প্রতুলনীয় বঙ্গবন্দনা ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই’ হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের আরাম। বর্ষণমুখর রাতে বাঙালির আর্তপ্রকাশ দেখতে পাই ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’ বা ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে’ গানের আকুলতায়। তেমনই এমন কোনও জীবন-মুহূর্ত নেই, যেখানে সপ্রাণ অনুভূতি প্রকাশের জন্য বাঙালির কাছে কোনও ‘গীতাঞ্জলি’ নেই।

        কথায় বলে ‘বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ’— যেখানে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী, দুর্গা-কালী-সরস্বতী-কার্তিক-জগদ্ধাত্রী ইত্যাদি পুজো থেকে মহরম, রমজান, ইদ, বড়দিন, ছট প্রভৃতি বাঙালির জীবনশৈলীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। মহালয়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত মাতৃবন্দনা ‘যা দেবী সর্ব্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ নমো নম।।’ বা সুপ্রীতি ঘোষের অপার্থিব কণ্ঠে ভক্তি-অঞ্জলি ‘বাজল তোমার আলোর বেণু, মাতল রে ভুবন’ প্রভৃতি ইতিমধ্যেই বাংলার সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে গেছে

        পূর্বজদের জন্য বাঙালি আকাশ-প্রদীপ জ্বালে, নবাগতদের মঙ্গলে করে ষেঠেরা (ষষ্ঠী) পূজার মঙ্গলাচরণ। বঙ্গবধূ অশুভ দৃষ্টি থেকে শিশুকে রক্ষা করতে তার পাশ কপালে লাগায় কাজলের ফোঁটা।  বঙ্গনারী দেবীকে ঘরের মেয়ে বলেই মান্যতা দেয়। ফলে বিসর্জনে মা হিসাবে কনকাঞ্জলি গ্রহণ করে, নিজেরা পরস্পরের মঙ্গলকামনায় সিঁদূরখেলায় মাতে। শাশুড়ি মা জামাই ষষ্ঠীতে জামাই আদরের সঙ্গে পাখার বাতাস দিয়ে তার বিপদ-বালাই দূর করে, বোনেরা ভাতৃদ্বিতীয়ায় ভাইফোঁটা দিয়ে যম-দুয়ারে কাঁটা বিছায় অপি চ বাঙালি থেকে ভারতীয়ত্বে উত্তরণের ফলে ভাইয়ের হাতে রাখিও পরায়, ইতু (ইন্দ্র) পূজার মাধ্যমে বাঙালি শস্যপূর্ণা বসুন্ধরার স্বপ্ন দেখে, ঘেঁটু (ঘণ্টাকর্ণ) পূজার মাধ্যমে সন্তান-সন্ততিদের রোগবালাই দূর করার অভিলাষ করে।

        বাঙালি হিন্দু সত্যপীরের দরগায় সিন্নি-বাতাসা চড়ায় মনস্কামনা পূর্ণ হলে, সংসারের মঙ্গলকামনায় সত্যনারায়ণ পূজার আয়োজন করে। বিপরীতে কোনও বাঙালি মুসলমান রমণী সীমন্তে সিঁদূর ধারণ করে স্বামীর হিতকামনায়। সত্যিই বড় বিচিত্র এই বাংলার সংস্কৃতি!

        আর চিত্রকলায়? রবি বর্মার শিব-পার্বতী বিষয়ক চিত্রকলাকে বাঙালি আত্মীয়করণ করেছে, বাঙালির প্রতিভূ উদয়শঙ্কর নৃত্যের অঙ্গনে সম্প্রতি-প্রয়াতা জোহরা সেহগলের সাহচর্যে সেই শিব-পার্বতীকে রূপদানের মাধ্যমে অবিনশ্বর করেছেন। ‘ছবিলেখক’ অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ চিত্র, রবীন্দ্রনাথের বিমূর্তধর্মী নারী অবয়ব, নিসর্গ চিত্র, গগনেন্দ্রনাথের ঘনকীয় চিত্র, সমাজে প্রচলিত অন্যায়-কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কশাঘাতকারী ব্যঙ্গচিত্র, যামিনী রায়ের  অতিসরল জননী প্রতিকৃতি (যা দেখলেই ‘মা বলিতে প্রাণ করে আন চান, চোখে আসে জল ভরে), নন্দলাল বসুর স্বল্পরৈখিক মানব তথা নিসর্গ চিত্র থেকে বিকাশ ভট্টাচার্যের মানবীর মধ্য দেবীসন্ধান, ধাবমান অশ্বের বিচিত্র ভঙ্গিমা, গণেশ পাইনের লোকায়ত ভাবের ঐশ্বরীয় মহিমায় উত্তরণশীল চিত্রায়ণ, তাঁর ‘পোয়েটিক স্যুর-রিয়েলিজম’ বাংলার সংস্কৃতিকে একই সঙ্গে ঋদ্ধ ও ধারণ করেছে। এছাড়া কালীঘাটের পট, পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত-সাম্প্রতিক ঘটনা বিষয়ক বাংলার পটচিত্র (পটের গান সহ), নকশি কাঁথা, মন্দিরগাত্রে খোদিত ইতিহ্যবাহী চিত্রকলা ইত্যাদি বাংলার সংস্কৃতির সরল অথচ ভাবগম্ভীর আত্মপটসাধনা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়।

        চলচিত্রের মৌন, মুখর দু’টি যুগেই বাঙালির অবদান আজ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী(ডি. জি.) থেকে সত্যজিৎ রায় দীর্ঘপটে জীবনের বিচিত্র প্রকাশে চলচ্চিত্রের অভিধাই বদলে দিয়েছেন। সে পথের পাঁচালি হোক বা পরশপাথর, তার পরশে বাঙালির মননভূমি ‘কষিত কনককান্তি, কমনীয় কায়’। ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে  ঢাকা  তারায় মৃত্যুপথযাত্রিণী নারীর আকুল আর্তনাদ “দাদা আমি বাঁচতে চাই, দাদা আমি বাঁচতে চাই’’ চিরকালীন জীবনতৃষ্ণায় পরিণত। কিংবা তাঁর ‘যুক্তি, তক্কো, গল্প’-এ ‘কেন চেয়ে আছো গো মা মুখপানে’-তে বিশ্বাস ও স্বপ্নভঙ্গের যে বিশ্বাস্য চিত্রকল্প দেখি, তা বাঙালির হৃদয়বীণায় চিরকাল বিষণ্ণ ভৈরবী রাগিনী অনুরণিত করতে থাকবে।

        পরিধানে বাঙালিকে বিশিষ্ট করেছে ধুতি, পাঞ্জাবি, শাড়ি, ইত্যাদি। কিন্তু কর্মস্বাচ্ছন্দ্য ও বিশ্বপ্রবণতার প্রয়োজনে বাঙালি প্যান্ট-শার্ট-সালোয়ার-কামিজ-লেহেঙ্গা-চোলিতেও সমান স্বচ্ছন্দ। তাই কবি বলেছেন, ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’। সাধারণভাবে না হলেও, বিবাহাদি উৎসবে বাঙালির অঙ্গে মুগোর ধাক্কাপাড় কোঁচানো ধুতি, শৈল্পিক কাজ করা পাঞ্জাবি, উজ্জ্বল বেনারসি ইত্যাদি অনন্যসাধারণ হয়ে ওঠে। যুগের সঙ্গে বাঙালি সমান প্রাগ্রসর। যুগের প্রয়োজনেই তাই ‘বিদেশী বর্জন’ আহ্বান ‘ছেড়ে দাও রেশমি চুড়ি, বঙ্গনারী, কভু হাতে আর পরো না’ কিংবা ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নেরে ভাই/ দীন-দুখিনী মা যে তোদের, এর বেশি আর সাধ্য নাই’— তাদের কাছে দেশমাতৃকার আহ্বান  হয়ে ওঠে, তাই তারা সহজেই সাড়া ও মান্যতা দেয়।

        আবার খেলার মাঠে বাঙালিই পারে তার ঊর্ধ্ববাস খুলে তারুণ্যের বিজয়কেতন ওড়াতে। কারণ সেই ঔপনিষদ মন্ত্র তার মনে সাহস জোগায় ‘অপাবৃণু! অপাবৃণু!!’ (আবরণ উন্মোচন করো। আবরণ উন্মোচন করো।) ‘আত্মানং বিদ্ধি’ (আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি কর, আর অনুভব ও ঘোষণা কর যে যে তোমরাও অমৃতস্য পুত্রাঃ)

        বসনের মত অশনেও বাঙালির স্বকীয়তা অনস্বীকার্য। সঘৃত অন্নব্যঞ্জন, যার মধ্যে সুক্তো-ডাল-পোস্ত-শাক-কালিয়া-ইলিশ রোহিতাদি মৎস্যের প্রাবল্য, ছাগ-কুক্কুট মাংসের অনায়াস পৌষ্টিক উপস্থিতি, পায়স-পিঠা-দধি- সন্দেশ-রসগোল্লা-পান্তুয়া-ল্যাংচা- লবঙ্গলতিকা-মিহিদানা-সীতাভোগের সরস সঙ্গত এবং মুখশুদ্ধি অম্বলাদির পরিপাকীয় অনুপান উল্লেখনীয়, বাঙালিকে ‘অন্নময় প্রাণ’-এর সন্ধান দেয়।

        প্রকৃতপক্ষে বাংলার সংস্কৃতিতে মহামিলনের বীজ উপ্ত দেখতে পাই। কবি রবীন্দ্রের অনুভব ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি/ জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি’। সমান্তরালভাবে ভারত পথিক রামমোহন, বিশ্ববিবেক বিবেকানন্দের হাত ধরেও বাঙালিও তাই বিশ্বমানবতা তথা বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধে অনুপ্রাণিত।

        তাই বাংলার সংস্কৃতি বলতেই জীবনের চলার পথে প্রয়োজনীয় কতকগুলি মূল্যবোধের কথা মনে পড়ে যায়। গুরুজন ও অগ্রজদের প্রতি শ্রদ্ধা সম্ভ্রম (পিতৃদেবো ভব, মাতৃদেবো ভব বিধায়), অনুজদের প্রতি সস্নেহ প্রশ্রয়, দীনার্তদের অভয়াশ্রয়, আগামী পুরুষের জন্য প্রার্থনা (‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ বা ‘প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’), সমবয়স্কদের প্রতি বিনম্র ব্যবহার, সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, অল্পেতে তুষ্ট থাকা (সন্তোষম্‌ ওষধিঃ), বিদ্যোৎসাহ (নাস্তি বিদ্যা সমা শক্তিঃ), বিনম্রীভাব, অপরের প্রতি দ্বেষহীনতা (মা বিদ্বিষামহে), আপন ধর্ম বা সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও পরধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সহিষ্ণুতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থেকেও প্রতিবেশীদের প্রতি মমত্ববোধ, মানুষকে দেবাংশী জ্ঞানে সেবা, পরবাসে গিয়েও নিজ শিকড়ের প্রতি নাড়ির টান ইত্যাদি।

        রবীন্দ্রনাথ দেশকে ‘ভারততীর্থ’ অভিধা দিয়েছেন। বাংলা সেই তীর্থের মধ্য আর এক তীর্থ, এক অন্য কবির ভাষায় ‘আমরা বাঙালি বাস করি সেই তীর্থ বরদ বঙ্গে’। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাঙালি প্রাণের জোরে বেঁচে আছে, তাই ছন্দের জাদুকর কবি সগর্বে বলেছেন, ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি’। আবার এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রাণোচ্ছলতা দেখে গুপ্ত কবি বলেছেন, ‘কত ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা’। এই প্রতিকূলতার মাঝেও তাই আত্মসন্ধানী বাঙালি নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করে কবি শক্তির বকলমে ‘অবনী, বাড়ি আছো?’ যতদিন বাংলা থাকবে, বাংলার সংস্কৃতি থাকবে, বাঙালি থাকবে, ততদিন এই আত্মজিজ্ঞাসা চলতেই থাকবে, ‘অবনী, বাড়ি আছো?’ ‘অবনী, বাড়ি আছো? ‘অবনী, বাড়ি আছো?... ... 


শ্রীমন্ত সেন - হুগলি 

             

Monday, 19 April 2021

মকর পরব ও টুসুগান - সৃজিতা ধর

 

নিবন্ধ

 সারা বছরের হাঁড় ভাঙা খাটনিতে যখন শরীর আর মন দুটোই ক্লান্ত তখনই হালকা হিমেল পরশ নিয়ে প্রাণে উৎসবের জোয়ার নিয়ে আসে মকর পরব। বিখ্যাত এই কৃষিভিত্তিক লোক উৎসব টুসু পরব নামেও পরিচিত। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগণার আদিবাসী ও মূলবাসীদের কাছে এই মকর পরব বহু প্রতীক্ষিত এক লোক উৎসব। মকর পরব বা টুসু পরবের সাথে টুসু গানের এক নিগূঢ় সম্পর্ক যেখানে ধামসার তালে মন গেয়ে ওঠে- 
"মকর পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইনছে
টুসু মনি ধামসার ব্যুলে দিখো কিমন লাচিছে"
টুসু গানে সাহিত্যধর্মীতা নেই, আছে বক্তব্যধর্মীতা। তাই গানের বিষয়বস্তু যা কিছু হতে পারে। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সাবলীলভাবে প্রকাশ পায় এই টুসু গানের মাধ্যমে। 

               অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি- এই একমাস ব্যাপী এইসকল "সুনা দেহে ঘাম ঝড়ানো" মানুষগুলো এই উৎসব পালন করেন টুসু দেবীর পূজোর মাধ্যমে। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তির সন্ধ্যায় একটি মাটির পাত্রে তুষ রেখে তার ওপর ধান, দূর্বা, আকন্দ, বাসক ফুল, গাঁদা ফুলের মালা, আরও অনেক সামগ্রী রাখা হয়। পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত এই সকল সামগ্রী সম্বলিত পাত্রটিকে টুসু জ্ঞানে পূজো করা হয়। প্রতি বাড়িতে 'আউছি' চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে তৈরি করা হয় এই সময়। ঘরের মেয়ে রূপে পূজিত এই টুসু মনি নামকরণের পেছনে ধানের তুষ-কেই অনেকে মনে করেন; অর্থাৎ মনে করা হয় যে 'তুষ' থেকেই 'টুসু' নামটি এসেছে। টুসু দেবীকে কখনো মেয়ে রূপে, কখনো সখি রূপে পূজো করা হয়। টুসু গানের মধ্য দিয়ে আবার কখনো কখনো ভালোবাসার কথাও প্রকাশ পায়। টুসু গানে তাই বলা হয়েছে-
  "যা যা টুসু যা যা লো
       দেখা গেছে তোর পিরিত লো
   তোর পিরিতে মন মানে না
        বলি তোর পিরিতে আগুন জ্বলে না।"    
               
                পৌষ মাসের শেষ চারদিনের টুসু পরবের নাম- চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, আখান এবং মকর। চাঁউড়ির দিন গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে গোবর মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। তারপর চালের গুঁড়ো তৈরি করা হয়। বাঁউড়ির দিন অর্ধ চন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি, চতুষ্কোণাকৃতি পিঠে তৈরি করে চাঁছি, তিল, নারকেল ইত্যাদি সহযোগে পুর দেওয়া হয়। এই পিঠে গুলোকে‌ গড়গড়্যা পিঠে বলা হয়। বাঁউড়ির দিন রাতে সারারাত টুসু গানের মাধ্যমে টুসু জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়। পৌষ মাসের শেষ দিন অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির দিনটিকেই আমরা মকর সংক্রান্তি বলে থাকি যেটা তাদের কাছে মকর পরব নামে খ্যাত। এই একমাস ব্যাপী সময়ে গোটা গ্রাম সেজে ওঠে, জায়গায় জায়গায় নাচ-গান চলে, মেলার আয়োজন করা হয়। তাইতো লোকসংগীতে বলা হয়েছে-
               "পরব দিনে মেলায় যাব
               ধামসা মাদল সঙ্গে লিব
               সুরগুঞ্জা ফুটে লালে লাল
               তোর ঘুঙুরাটা দিবে লাকি তাল..."

মকর পরবের দিন টুসু মনিকে তারা স্থানীয় পুকুরে বা নদীতে ভাসান দেয়। উজ্জ্বল রঙিন চৌডালায় টুসু দেবীকে সাজিয়ে গানের সুরে হয় টুসু মনির বিসর্জন। বিসর্জনের মনখারাপে মেয়েরা গেয়ে ওঠে-
 "টুসু আমার খায় না কিছু
              শুখাই গেল চাঁদবদন
 রাত হইলে চান্দ্ ধইরে দেব
                কেন্দো না গো টুসুধন
 মোদের মনের এই বাসনা
               টুসুধনকে জলে দিব না।"

কিন্তু নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতে পারে না তাদের আদরের টুসু মনি। আবার দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষায় রেখে দিয়ে টুসু মনি বিদায় নেয়। ভাসানের সময় তাই শোনা যায়- "জল জল‌ করো টুসু/জলে তুমার কে আছে?" তখন‌ যেন টুসু মনি গানের সুরে বলে- "মনেতে ভাবিয়ে দেখো/জলে সসুর ঘর আছে।" 

             টুসু দেবীর বিসর্জনের পরে শুরু হয় মকর স্নানের‌‌ পালা। শিলাবতী, কংসাবতী, অজয় প্রভৃতি নদীতে তারা স্নান‌ সেরে কাপড় বদলে আসে। আমরা যেমন গঙ্গা স্নানকে পুন্য স্নান মনে‌ করি, তারাও এই মকর স্নানকে সেই পর্যায়েই ফেলে। তাইতো লোকসংগীতে বলা হয়েছে-
            "মকর দিনে অজয় লদী
                              গঙ্গার রূপ ধরে
             গঙ্গা সিনান ভবে মানুষ
                        অজয় সিনান‌ করে..."

বিশ্বায়ন ও নগরায়নের নাগপাশে আটকে যাওয়া বাঙালী লোকসংস্কৃতির মূল সুর এখনও এই ধরনের পরবগুলো ধরে রেখেছে। বহু সুখ-দুঃখের, বহু ওঠা-নামার পর তারা এই মকর‌‌ পরবের বা টুসু পরবের একমাস মনের সমস্ত গ্লানি মুছে একসূত্রে বাঁধা পড়ে 'বিনি সুতোর মালা' হতে চায়। এভাবেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে আমাদের বিভিন্ন সাঁওতাল পরগণা, লালমাটির বাঁকুড়া। মকর‌ পরবের গান, ধামসার তাল, মাদলের বোল, ঘুঙুরের শব্দ সব মিলিয়ে গ্রাম বাংলার রূপের যে পরিবর্তন ঘটে তা অভাবনীয়। মন চায় ধামসার তালে ঘুঙুরের তাল তুলতে আর সাথে থাকবে চির নূতন লোকসংগীতের সুর-

"মকর দিনে বিহান কালে গেল লদীর পার
হলুদ রাঙা মুড়ি খাইয়ে ঠোঁটের কি বাহার
রাঙা ঠোঁটে রাঙা মুড়ি দিখো‌ কিমন‌ মানাইনছে
মকর‌ পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইনছে।" 


সৃজিতা ধর - কলকাতা 


করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...