Monday, 19 April 2021

মকর পরব ও টুসুগান - সৃজিতা ধর

 

নিবন্ধ

 সারা বছরের হাঁড় ভাঙা খাটনিতে যখন শরীর আর মন দুটোই ক্লান্ত তখনই হালকা হিমেল পরশ নিয়ে প্রাণে উৎসবের জোয়ার নিয়ে আসে মকর পরব। বিখ্যাত এই কৃষিভিত্তিক লোক উৎসব টুসু পরব নামেও পরিচিত। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগণার আদিবাসী ও মূলবাসীদের কাছে এই মকর পরব বহু প্রতীক্ষিত এক লোক উৎসব। মকর পরব বা টুসু পরবের সাথে টুসু গানের এক নিগূঢ় সম্পর্ক যেখানে ধামসার তালে মন গেয়ে ওঠে- 
"মকর পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইনছে
টুসু মনি ধামসার ব্যুলে দিখো কিমন লাচিছে"
টুসু গানে সাহিত্যধর্মীতা নেই, আছে বক্তব্যধর্মীতা। তাই গানের বিষয়বস্তু যা কিছু হতে পারে। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সাবলীলভাবে প্রকাশ পায় এই টুসু গানের মাধ্যমে। 

               অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি- এই একমাস ব্যাপী এইসকল "সুনা দেহে ঘাম ঝড়ানো" মানুষগুলো এই উৎসব পালন করেন টুসু দেবীর পূজোর মাধ্যমে। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তির সন্ধ্যায় একটি মাটির পাত্রে তুষ রেখে তার ওপর ধান, দূর্বা, আকন্দ, বাসক ফুল, গাঁদা ফুলের মালা, আরও অনেক সামগ্রী রাখা হয়। পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত এই সকল সামগ্রী সম্বলিত পাত্রটিকে টুসু জ্ঞানে পূজো করা হয়। প্রতি বাড়িতে 'আউছি' চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে তৈরি করা হয় এই সময়। ঘরের মেয়ে রূপে পূজিত এই টুসু মনি নামকরণের পেছনে ধানের তুষ-কেই অনেকে মনে করেন; অর্থাৎ মনে করা হয় যে 'তুষ' থেকেই 'টুসু' নামটি এসেছে। টুসু দেবীকে কখনো মেয়ে রূপে, কখনো সখি রূপে পূজো করা হয়। টুসু গানের মধ্য দিয়ে আবার কখনো কখনো ভালোবাসার কথাও প্রকাশ পায়। টুসু গানে তাই বলা হয়েছে-
  "যা যা টুসু যা যা লো
       দেখা গেছে তোর পিরিত লো
   তোর পিরিতে মন মানে না
        বলি তোর পিরিতে আগুন জ্বলে না।"    
               
                পৌষ মাসের শেষ চারদিনের টুসু পরবের নাম- চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, আখান এবং মকর। চাঁউড়ির দিন গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে গোবর মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। তারপর চালের গুঁড়ো তৈরি করা হয়। বাঁউড়ির দিন অর্ধ চন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি, চতুষ্কোণাকৃতি পিঠে তৈরি করে চাঁছি, তিল, নারকেল ইত্যাদি সহযোগে পুর দেওয়া হয়। এই পিঠে গুলোকে‌ গড়গড়্যা পিঠে বলা হয়। বাঁউড়ির দিন রাতে সারারাত টুসু গানের মাধ্যমে টুসু জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়। পৌষ মাসের শেষ দিন অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির দিনটিকেই আমরা মকর সংক্রান্তি বলে থাকি যেটা তাদের কাছে মকর পরব নামে খ্যাত। এই একমাস ব্যাপী সময়ে গোটা গ্রাম সেজে ওঠে, জায়গায় জায়গায় নাচ-গান চলে, মেলার আয়োজন করা হয়। তাইতো লোকসংগীতে বলা হয়েছে-
               "পরব দিনে মেলায় যাব
               ধামসা মাদল সঙ্গে লিব
               সুরগুঞ্জা ফুটে লালে লাল
               তোর ঘুঙুরাটা দিবে লাকি তাল..."

মকর পরবের দিন টুসু মনিকে তারা স্থানীয় পুকুরে বা নদীতে ভাসান দেয়। উজ্জ্বল রঙিন চৌডালায় টুসু দেবীকে সাজিয়ে গানের সুরে হয় টুসু মনির বিসর্জন। বিসর্জনের মনখারাপে মেয়েরা গেয়ে ওঠে-
 "টুসু আমার খায় না কিছু
              শুখাই গেল চাঁদবদন
 রাত হইলে চান্দ্ ধইরে দেব
                কেন্দো না গো টুসুধন
 মোদের মনের এই বাসনা
               টুসুধনকে জলে দিব না।"

কিন্তু নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতে পারে না তাদের আদরের টুসু মনি। আবার দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষায় রেখে দিয়ে টুসু মনি বিদায় নেয়। ভাসানের সময় তাই শোনা যায়- "জল জল‌ করো টুসু/জলে তুমার কে আছে?" তখন‌ যেন টুসু মনি গানের সুরে বলে- "মনেতে ভাবিয়ে দেখো/জলে সসুর ঘর আছে।" 

             টুসু দেবীর বিসর্জনের পরে শুরু হয় মকর স্নানের‌‌ পালা। শিলাবতী, কংসাবতী, অজয় প্রভৃতি নদীতে তারা স্নান‌ সেরে কাপড় বদলে আসে। আমরা যেমন গঙ্গা স্নানকে পুন্য স্নান মনে‌ করি, তারাও এই মকর স্নানকে সেই পর্যায়েই ফেলে। তাইতো লোকসংগীতে বলা হয়েছে-
            "মকর দিনে অজয় লদী
                              গঙ্গার রূপ ধরে
             গঙ্গা সিনান ভবে মানুষ
                        অজয় সিনান‌ করে..."

বিশ্বায়ন ও নগরায়নের নাগপাশে আটকে যাওয়া বাঙালী লোকসংস্কৃতির মূল সুর এখনও এই ধরনের পরবগুলো ধরে রেখেছে। বহু সুখ-দুঃখের, বহু ওঠা-নামার পর তারা এই মকর‌‌ পরবের বা টুসু পরবের একমাস মনের সমস্ত গ্লানি মুছে একসূত্রে বাঁধা পড়ে 'বিনি সুতোর মালা' হতে চায়। এভাবেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে আমাদের বিভিন্ন সাঁওতাল পরগণা, লালমাটির বাঁকুড়া। মকর‌ পরবের গান, ধামসার তাল, মাদলের বোল, ঘুঙুরের শব্দ সব মিলিয়ে গ্রাম বাংলার রূপের যে পরিবর্তন ঘটে তা অভাবনীয়। মন চায় ধামসার তালে ঘুঙুরের তাল তুলতে আর সাথে থাকবে চির নূতন লোকসংগীতের সুর-

"মকর দিনে বিহান কালে গেল লদীর পার
হলুদ রাঙা মুড়ি খাইয়ে ঠোঁটের কি বাহার
রাঙা ঠোঁটে রাঙা মুড়ি দিখো‌ কিমন‌ মানাইনছে
মকর‌ পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইনছে।" 


সৃজিতা ধর - কলকাতা 


No comments:

Post a Comment

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...