Monday, 19 April 2021

মন - তনিমা হাজরা

 

মুক্তগদ্য 

আমাদের বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম পঁচিশটি বর্ণকে যে স্পর্শবর্ণ বলা হয়ে থাকে তা আমরা সবাই জানি। ওষ্ঠ স্পর্শ করে উচ্চারিত প-বর্গের শেষ বর্ণ "ম" এবং দন্ত্য স্পর্শ করে উচ্চারিত ত-বর্গের শেষ বর্ণ "ন" নিয়েই মন কথাটির জন্ম। 
সর্বশেষ সবচেয়ে তীব্রতম স্পর্শ। আবার উচ্চারণ তত্ত্ব অনুযায়ী প্রত্যেক বর্গের ১ম, তয় এবং ৫ম বর্ণকে অল্পপ্রাণ বর্ণও বলা হয়ে থাকে। কারণ এই বর্ণগুলি উচ্চারণকালে সমস্ত প্রাণবায়ু বুকের ভেতর চেপে রেখে আমরা খুব অল্পই নির্গত করে থাকি।। 
তাহলেই বুঝুন ম এবং ন দুটি অক্ষর নিয়ে তৈরি "মন" এই শব্দটি এত গভীর কেন।। 
আমার কেন যেন মনে হয়েছে এটাও জীবতত্ত্বের দিক দিয়ে ভাবার বিষয়। দুটি অল্পপ্রাণ বর্ণসমন্বয় শরীরের ভেতর তার শ্বাসবায়ুর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে নিরন্তর।। 

আর আমরা মানুষকে চিনতে তার মনটাকে বুঝতেই চাইছি না। শরীর খারাপ হলে ডাক্তার ডাকছি কিন্তু মন ব্যাপারটাকে আমলই দিতে চাইছি না।। কিংবা অনেকক্ষেত্রেই শারীরিক অত্যাচার এর জন্য আইন আদালত বিচারব্যবস্থার শরণাপন্ন হচ্ছি কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীরব বা সরব মানসিক অত্যাচারগুলির একেবারেই প্রতিকার বা বিচার হচ্ছেই না।। 

বিত্ত কথাটা আমি ব্যবহার করব না, এক্ষেত্রে মেধা বা মনন শব্দটা আমার যৌক্তিক মনে হয়েছে। কারণ মনের সঠিক অনুধাবন বা মনের অসুখকে উদার মানবিক আধারে দেখা বা না দেখা উচ্চ বা নিম্ন মেধা বা মনন এর পরিচয় বহন করে।। 

অনেক ক্ষেত্রে এইসব নিম্নমননের মানুষদের দেখেছি মনের স্পর্শকাতর অবস্থায় অবস্থান করা  মানুষকে নিয়ে উপহাস, পরিহাস করতে। ও তো পাগল,  ও তো রাগী, ও তো বেয়াড়া, এসব আলোচনা চর্চা সেই মানুষটির সামনেই করছেন অথবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডময় নিন্দেমন্দ করে বেড়াচ্ছেন । কিন্তু কিছুতেই কাউন্সেলিং বা মনরোগবিশেষজ্ঞ এর কাছে নিয়ে গিয়ে সমস্যাটা মেটাবেন না। কারণ তাদের কাছে মনরোগবিশেষজ্ঞ মানে "পাগলের ডাক্তার" আর চিকিৎসা মানে " পাগলের ট্রিটমেন্ট"। 
তবে শুধুমাত্র পাশাপাশি অবস্থান করা মানুষেরাই নন। যিনি নিজে মনোরোগে ভুগছেন তিনিই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তার বা কাউন্সেলর এর কাছে যেতে রিভোল্ট করেন,  "কেন যাবো আমি কি পাগল"?? 

মন বলে আমি 
মনের কথা জানি না, 
তারায় তারায় উড়ে বেড়ায় 
মাটিতে সে নামে না। 
সাঁঝের তারা হাতছানি দেয় 
ভোরের তারা টানে, 
সাগর ঢেউয়ে ভেসে যায় সে 
কোন পারে কে জানে, 
দেহ আমার চলতে নারে 
বইতে নারে ভারে, 
হালকা হাওয়ায় পালকি চড়ি, 
কোথাও সে যে থামে না। 
মন বলে আমি 
মনের কথা জানিনা *****(হারমোনিয়াম সিনেমার সেই বিখ্যাত গান- লিরিক- তপন কুমার সিনহা)।।

একটি মন আর একটি শরীর মিলিয়ে এই দেহ। যার মধ্যে শরীর দৃশ্যমান আর মন অদৃশ্য। 

একটি সুন্দর শরীরের ভেতর লুকানো একটি অসুন্দর মন অথবা একটি অসুন্দর শরীরে নিহিত একটি সুন্দর মন অথবা সুন্দর শরীরে সুন্দর মন  এবং অসুন্দর শরীরে অসুন্দর মন বিবিধ প্রকার কম্বিনেশনই তো চোখে পড়ে। 

আবার দেখুন একটি বৃদ্ধ শরীরের মধ্যে তারুণ্যে ভরা একটি মন অথবা একটি তরুণ শরীরের ভেতর ঢের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ একটি মনন ও দেখা যায়। 

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে একটি দেহের ভিতর একসাথে সহাবস্থান করা একটি শরীর ও একটি মন যে সব সময় এক তালে নাচবে বা একসাথে হাঁটবে তার কোনো মানে নেই। বরং এই বিরুদ্ধতা বা দ্বন্দ্বের উদাহরণই নানা ক্ষেত্রে 
বেশি।  

পিতার শুক্রাণু আর মাতার ডিম্বাণু নিয়ে মাতৃগর্ভের ভেতর একটি শরীরের উৎপত্তি। শরীরের এই আকৃতি, রঙ, গঠন অথবা যৌনবিভাগ কি হবে তা নির্ধারণ করে শুক্রাণু বা  ডিম্বাণুর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য সেকথা জীববিদ্যা বলে, 
কিন্তু একজন মানুষের মন কেমন হবে সেটা নির্ধারণ হবে কিসে? 

একটি শিশু জন্মগ্রহণ করবার সময়ই কী নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্যর সাথে সাথে একটা মানসিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই জন্মায়, নাকি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং পরিস্থিতি তার মধ্যে একটি মানসিক গঠন তৈরি করে? 

আমি বলব দুটোই। 

একটি শিশু জন্মানোর সময় তার দেহের মধ্যে একটি নবজাত শরীরের সাথে সাথে একটি নবজাত মনও নিয়েই জন্মায়। অনুকূল বা প্রতিকূল পরিস্থিতির ঘাত প্রতিঘাতে যেমন শরীরের বৃদ্ধি, ক্ষয় বা ভাঙচুর হয় সেগুলো আমরা চোখে দেখতে পাই তাই বলি, আহা তোমাকে এমন কাহিল লাগছে কেন হে, ঠিক ঠাক খাওয়া দাওয়া করো, একবার চেকআপ করাও, দেখো টেষ্ট রিপোর্ট সব ঠিক আছে তো? 
শরীরের রোগের নানা নাম আছে এবং ধ্বংস করার গুরুত্ব অনুযায়ী আছে তাদের নিরাময় বা মৃত্যু। 

কিন্তু মন বস্তুটাকে যেহেতু আমরা চোখে  দেখতে পাই না তাই এর স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে একেবারেই মাথা ঘামাই না। শেষ মেষ পরিস্থিতি যখন আমাদের কন্ট্রোলের বাইরে চলে যায় তখনই সেটা একটা সাংঘাতিক ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্ম দেয়।। 

এই ধ্বংসাত্মক ঘটনা সেই ব্যাক্তি বিশেষের মানসিক রোগের প্রাবল্য বা বৈশিষ্ট্যের বিভিন্নতা অনুযায়ী আত্মহত্যাপ্রবণতা  কলহপরায়ণতা, ধর্ষণপ্রবণতা, হত্যাপ্রবণতা, চৌর্য্যবৃত্তি, অত্যাচারমনষ্কতা অথবা আরও নানাপ্রকার  ক্রিমিনাল অবসেশন অথবা এগজিবিশনিজম কিংবা নির্লিপ্ত জনবিমুখতা আবার ফ্ল্যাকচ্যুয়েটিং এ্যাক্ট ডিস অর্ডার যা  কিছু হতে পারে।। 


এটা তো আমরা আমাদের চারপাশে প্রায়শঃই দেখি যে একজন পুরুষদের মতো গলার স্বর, দেহের বলিষ্ঠতা এবং শ্মশ্রুগুম্ফ নিয়ে কিছু মানুষ নারীর মতো আচরণ করেন অথবা সাজগোজ করে  আমাদের আশেপাশে ঘোরেন। 
এঁদের আমরা "লেডিস", ক্যাওড়া, হিজড়ে বলে ব্যঙ্গ করি। কেউ কেউ লজ্জা এড়াতে এঁদের সংসার থেকে নির্বাসন দেন। ফলে এঁরা শিক্ষাগত বা পারিবারিক সম্পত্তিগত ব্যাপারে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নেন।  এঁদের দুটো পয়সা দাক্ষিণ্য করে নিজেকে খুব দানবীর মনে করি। কিন্তু এঁদের এই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা তো আমাদেরই একপ্রকার শোষণ তাঁদের প্রতি। 

আবার এও দেখা গেছে যারা তাঁদের একেবারে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিই না, লেখাপড়া শেখাই, তাঁরা  সংসারে এইরকম একজন মানুষ থাকলে তাঁকে  যথাসাধ্য পুরুষ সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করি। জোর করে একজন নারীর সাথে বিবাহও দিয়ে দিই অনেক ক্ষেত্রে। 
কে দিয়েছে আমাদের এতবড় সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার?  কিভাবে পেয়েছি আমরা এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার? সেকি কেবলমাত্র আমাদের পুরুষ বা নারী শরীরে পুরুষ বা নারী মন জন্মগতভাবে  যথাযথ স্থিত আছে বলে?  

আর তাঁদের জন্মগত ভাবে এই যে পুরুষ শরীরে নারীমন অথবা নারী শরীরে পুরুষ মন তাতে তাঁদের কি কোনো হাত আছে?  তাহলে তাঁরা কেন আমাদের এই তথাকথিত সংখ্যাগরিষ্ট দৈহিক অবস্থানের মানুষের সমাজ থেকে ব্রাত্য হবেন? তাঁরা কেন একজন গোটা পুরুষ বা গোটা নারীর মতো স্বাভাবিক সম্মান পাবেন না?  কেন তাঁরা বারবার অযাচিত প্রশ্ন বা ব্যঙ্গের শিকার হবেন?  
তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে তাঁরা কেন যেকোনো জীবিকার জন্য পরীক্ষা দিয়ে মনোনয়ন পাবেন না?  কেন তাঁদের সংরক্ষিত শ্রেণীতে দরখাস্ত করতে হবে?  

একটি পুরুষ শরীর যখন একটি পুরুষ মন ধারণ করে এবং ভালবাসার বা ইন্দ্রিয়ের বোধে একটি নারীর শরীর ও মন বিশিষ্ট একজন জীবের প্রতি  আকর্ষিত হয় তখন  যৌনতা কালে একটি পুরুষাঙ্গের সাথে একটি স্ত্রী যৌনাঙ্গের মিলন ঘটছে। এটা একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। 

কিন্তু একটি নারী মন নিয়ে জন্ম নেওয়া পুরুষ শরীর কিন্তু একটি নারীর সাথে ভালবাসায় আকর্ষিত হচ্ছেন না বা ইন্দ্রিয়ের টানে একটি নারীর শরীর চাইছেন না, তিনি একজন পুরুষ মন, পুরুষ শরীর চাইছেন। তখন যৌনতা কালে স্বাভাবিক দুটি স্ত্রী বা পুরুষ যৌনাঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে তাঁরা শরীরের দুর্নিবার যৌন ইচ্ছাটিকে পায়ুকামের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করছেন। কারণ তাঁরা নিরুপায়, এক্ষেত্রে শারীরিক ইচ্ছাকে প্রশমিত করার জন্য দুটি স্বাভাবিক যৌনাঙ্গের উপস্থিতি নেই।। 

আমাদের ভন্ড সমাজ এখানেও ভালো মন্দ, নৈতিক অনৈতিক প্রশ্ন তুলে মুরুব্বি সেজে স্বঘোষিত বিচারক হিসেবে বিচার করতে এগিয়ে আসছেন। কিন্তু অত্যন্ত বাস্তব প্রাকৃতিক ব্যাপারটা কেউ দৃষ্টিতে আনছেন না বা আনতে না চেয়ে সাধু সাজছেন।। 

ভেবে দেখুন আপনি নিজেও এই সাধুদের একজন নন কি?  যিনি একটি পুরুষ শরীরে জন্মগতভাবে একটি পুরুষ মন নিয়ে কিংবা একটি নারী শরীরে জন্মগতভাবে  একটি নারী মন নিয়ে জন্মে গেছেন বলে নিজেকে একজন তথাকথিত স্বাভাবিক বলে দাবি করে এঁদের সাজগোজ, ভঙ্গি কিংবা যৌন জীবন নিয়ে  ক্রিটিসাইজ করার একটা জন্মগত হক পেয়ে গেছেন।  

এই আপনাদের প্রশাসিত আইন ব্যবস্থা  তাঁদের তৃতীয় লিঙ্গ নামকরণ করেই শুধু ক্ষান্ত হননি। এই পরামর্শও দিচ্ছেন যে  স্বাভাবিক দাম্পত্যে যেতে হলে শারীরিক অপারেশন ইত্যাদি করে একটি গোটা গোটা পুরুষ বা গোটা গোটা নারী হয়ে যাও।। অথবা এখন থেকে আমরা খুব মুক্তমনা হয়ে গেছি তাই তোমাদের শিক্ষা, চাকুরি তে আসন সংরক্ষিত রাখছি।।

কিন্তু কেন? 

একজন মানুষের জন্য আর একজন মানুষ কেন এভাবে স্বঘোষিত নিয়ন্তা হয়ে উঠবে? এইভাবে তাঁদের অস্বাভাবিক প্রতিপন্ন করে রাখার চেষ্টা করে শোষণ করা কি নিজেকে স্বাভাবিক হিসেবে জাহির করা প্রত্যেক জন আমাদের চূড়ান্ত অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থার পরিচয় নয়?? 

আপনি কি স্বীকার করার ক্ষমতা রাখেন নিজের এই মানসিক অক্ষমতা?? 


তনিমা হাজরা - কলকাতা 


No comments:

Post a Comment

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...