Saturday, 17 April 2021

বেকারত্ব –অনীশ ব্যানার্জ্জী

 মুক্তগদ্য 


'চাকরি' এই তিন অক্ষরের একটা শব্দ যেন ত্রিভূবনের সব সুখ উজাড় করে দেয়। চাকরি পেলে অশিক্ষিত ব্যক্তিও যেন শিক্ষিত বেকারকে জ্ঞান দেবার ছাড়পত্র পেয়ে যায়। অসাধারণ বা উচ্চমেধাবীদের না হলে দেশ চলবে না তাই তাদের দুশ্চিন্তা নেই বেকারত্ব নিয়ে; নিম্ন মেধাবীদের সাধারনত কোন উচ্চাশা থাকেনা জীবনে, তারা যতটুকু পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। তারা লেখাপড়ায় এগোয়না বেশিদূর, অল্প বয়সেই রোজগারের পথ খুঁজে নেয়। সমস্যা এই মধ্যমেধাসম্পন্নদের নিয়ে, এক কথায় যারা মোটামুটি । তারা স্বপ্ন দেখে ভালোর মতো কিন্তু পারেনা, আবার নিম্ন মেধাসম্পন্নদের সাথেও হাত মেলাতে পারেনা, ছোট্ট কথায় বলতে গেলে ,

ভালো’ সবচেয়ে সুখী জীবনে, যা চেয়েছে পেয়েছে,

খারাপ’ ভাবে কী ভাগ্যি এইটুকু মোর  হয়েছে।

মোটামুটি’ এই দুইয়ের মাঝে কোনদিকে যে যায় ?

      স্বপ্ন তাহার ‘ভালো  হবার কিন্তু নাহি হয়।

 

অঞ্জন দত্ত আর বেলা বোসের কাহিনী আমরা সবাই জানি, বাস্তবটাও তাই কোন বেলা বোসই চেষ্টা করেনা নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অঞ্জন দত্তের মতো বেকারদের পাশে দাঁড়াতে। এতো গেল প্রেমের কথা, প্রেম সবার জীবনে আসেনা । এবার আসি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা যা আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হল আমাদের পরিবার। ছেলে বেকার বা চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, বয়স বেড়ে যাচ্ছে, এমন সময় বেশিরভাগ পরিবারের মানুষেরও আচরন যেন বদলে যায়।  ড. এ.পি.জে আবদুল  কালাম তার পরিবারকে 'স্ট্রং রুটস' বলে অভিহিত করেছেন, তিনি একথাও বলেছেন “যতদিন মানুষ চাকরির জন্য পড়াশোনা করবে ততদিন শুধু চাকরই জন্মাবে”। তিনি মানুষরূপি ঈশ্বর তার কথা হয়ত সত্যি কিন্তু বাস্তবে অনেকক্ষেত্রেই মেলেনা, কারন সবাই কালাম হয়না।  বেকারদের পাশে সবসময় পরিবার পাশে থাকেনা আর রোজগার করতে না পারলে যেন পড়াশোনা যেন অর্থহীন। পুরুষকে সর্বদাই রোজগেরে হতে হয় বিশেষ করে দরিদ্র আর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মালে।  সাধারনত কয়েকটি পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বেকার যুবকদের যে অপমান বা তেতো কথা হজম করতে হয় তার কয়েকটি নজির আমি নিম্নে তুলে ধরলাম,

 

 

.বেকার ছেলে অন্যকে ভালো বললে,

 অভিভাবক-: তোর কাছে কি আমরা ছাড়া সবাই ভালো?

২.বেকার ছেলে অন্যকে খারাপ বললে,

অভিভাবক-: ভালো কে ভালো বলতে শেখ অন্তত, নিজে হতে পারিস না পারিস।

৩.বেকার ছেলে ভালো জানে এইরকম কোনও বিষয়ে কিছু বললে,

অভিভাবক-: তুই কী সব জানিস? এত জ্ঞান যখন  তাহলে ঘরে বসে কেন ?

৪.বেকার ছেলে জানেনা এইরকম বিষয়ে  “ঠিক জানিনা” বলে চুপ করে বসে থাকলে,

 অভিভাবক-: কিছুই তো জানিসনা কী আর হবে ?; কুয়োর ব্যাঙ হয়ে ঘরেই বসে থাক।

৫.বেকার ছেলে টাকা চাইলে হয়ত টাকা দেন অভিভাবকরা কিন্তু সেই দেয়া কেমন একজন বেকারই বোঝে, আবার কখনও দেননা।

৬.বেকার ছেলে প্রতিবাদ করলে,

অভিভাবক-:আমরা তো যা চাইছিস তাই দিচ্ছি তারপরেও এইরকম বলছিস। (গায়ে বেইমানের তকমা লেগে যাবে)

৭.বেকার ছেলের অভিভাবকদের কাছে পাশের বাড়ি থেকে আত্মীয় স্বজন সবার ছেলে ভালো, নিজেরটাই বেকার। যারা পড়ছে সবাই চাকরি পাবে, যারা চাকরি করছে তারাও ভালো। শুধু তার ছেলেই কিছু পাবেনা, তারটাই দুনিয়ার সব থেকে অপদার্থ।

৮.বেকার ছেলে অন্যের আনন্দের সাথে নিজের  আনন্দ ভাগ করে নিয়ে মেতে উঠলে,

অভিভাবক-: ওর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবি ত? ও এর তুই এক?

৯.বেকার ছেলে অন্যের আনন্দে কর্ণপাত না করলে,

 অভিভাবক-: কী রে? এখানে? ওদিকে অমুক চলছে। তুই কী অন্যের ভালো এতটুকু দেখতে পারিস না?

১০.বেকার ছেলে যখন একটা সাধ মেটানোর আবদার নিয়ে আসে বাবা মার কাছে,

অভিভাবক-: তুই ছাড়া আর কেউ করছে? ত্রিভুবন দেখাতে পারবি?

       এক. একটা ভালো ছেলেকে উদাহরণ দিলে,

অভিভাবক-: কার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করছিস জানিস? একবার ভাব ওর নখের যোগ্য তুই?

       দুই. একটা খারাপ কাউকে উদাহরণ দিলে,

অভিভাবক-: নজর কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছিস। ঠিকই আছে নজর ঐদিকে বলেই তো বেকার হয়ে বসে আছিস।

      তিন. একটা সমমানের কাউকে উদাহরণ দিলে,

অভিভাবক-: ও করল বলে তকেও করতে হবে? নিজস্বতা নেই ? অনুকরন প্রিয় ছেলে কোথাকার।

১১.বেকার ছেলে  যখন সংসারে কোনো কাজ না করে,

 অভিভাবক -: চাকরি করতে না পারিস ঘরের কাজে তো একটু হাত লাগাতে পারিস।

১২.বেকার ছেলে যখন সংসারে কোন কাজ সুন্দর করে নিবেদন করে

অভিভাবক-: ছেলেটা ঘরকুনো হয়ে গেল, আর বেড়িয়ে চাকরি করতে পারবে না।

 

 উপসংহার-: একদিন ছেলে চাকরি পায়, না পেলেও দুনিয়ায় একটা কাজ খুঁজে নেয়। তখন এইরূপ আচরনের আচরনের প্রতিদান আসে, কেমন হবে তা আপনিই বলুন।

আর সবদোষ ? ছেলের বউএর ঘাড়ে গুঁজে দেবেন অভিভাবকগন।  সকলে সেটা বিশ্বাসও করবে। কেউ ভিতরের খবর নেয়না, ভিতরটা দেখেনা। আর কেউ চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার পথকে বেছে নেয় আর তখন লোকে বলে আত্মহত্যার আগে বাবা মায়ের মুখটা একবার মনে পড়ে না এদের? আত্মহত্যা করা অবশ্যই অন্যায় আমি স্বীকার করছি কিন্তু পরিবারের আচরনই যদি  একজনকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয় তখন কেন তাদের কথা মনে পড়বে মরার পূর্বে?


অনীশ ব্যানার্জ্জী ( পূর্ব বর্ধমান )


9 comments:

  1. খুব সুন্দর লেখা। এগিয়ে চলো বন্ধু।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ। এইভাবেই অনুপ্রেরণা দেবেন

      Delete
  2. darunnnnnn darunnnnnn, keep it up brother, god bless you 😊😊

    ReplyDelete
  3. খুব ভালো লিখেছিস ভাই। রূঢ় অথচ চরম বাস্তব।

    ReplyDelete

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...