প্রবন্ধ
" আর্বান লেজেন্ড" কথাটির আক্ষরিক অর্থ খুঁজতে গেলে
পাবেন লোকমুখে প্রচারিত রূপকথা,যা প্রধানত ভয় সঞ্চারকারী হয়ে থাকে। দেশে-বিদেশে এই সকল
গল্পকথা আদতে কিন্তু মানুষকে কিছু শিখিয়ে যেতে চায়। গল্পে ব্যাথা , বেদনা অথবা
রিপু দ্বারা তাড়িত হয়ে পরিশেষে তার ভয়াবহ পরিণতির কথা আগামী
প্রজন্মকে শিখিয়ে যেতে চায় কিছু নৈতিকতা । মানুষের মধ্যে নৈতিক বোধের উন্মেষের এ যেন
এক আকর্ষণীয় মাধ্যম।
তবে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে এরকম অসংখ্য রূপকথার গল্প।
সুতরাং সব কিছু এই স্বল্পপরিসরে বলা কার্যত অসম্ভব। এই প্রবন্ধে তাই মানুষের
অবিশ্বাসের কথা ও তাকে ঘিরে এক রূপকথা থুড়ি আর্বান লেজেন্ডের উপাখ্যান বর্ণনা করি
সহজসরল ভাষায় যা সবার বোধগম্য হয়ে উঠতে পারে।
পৃথিবীর প্রায় প্রতি প্রান্তে নিজ নিজ গল্প আছে। তবে এ গল্প
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে মানে সোজা ভাষায় আমাদের দেশের ঠিক উল্টো প্রান্তের এক
দেশের গল্প। যারা ব্ল্যাক ম্যাজিক বা উইচ ক্রাফট এসব নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়েছেন তারা
ভালভাবেই জানেন যে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি এ বিষয়ে খানিক অগ্রণী।
তবে প্রবন্ধ শুরু করার পূর্বে গুগল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের
পাশাপাশি মি. ম্যাথু মেয়ার এবং মিস.বারবারা জি. রিভাসকে কৃতজ্ঞতা অর্পণ কারণ
যেটুকু তথ্য জেনেছি সবকিছু ওঁদের কৃপায়।
এবার শুরু হোকঃ
প্রথমেই বলে রাখি কোন একটি রুপকথার সূত্রপাতে বর্ণিত
চরিত্রের নাম স্থান বিশেষে ভিন্ন হয় তাই চরিত্রের নাম নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে বিরত
থাকবেন। এই গল্পের সূত্রে আছে এক রূপবতী নারী যার নাম কোথাও ক্যাসিল্ডা আবার কোথাও
লুস্ মারিয়া বলে পাওয়া যায়। এই নারী বাসস্থান ছিল ভেনেজুয়েলার লস লানোস প্রদেশে।
সময়কাল আনুমানিক বলা হয় কলোনিয়াল পিরিয়ডে। অর্থাৎ স্প্যানিশরা যে সময়ে
ভেনেজুয়েলাতে আধিপত্য জমিয়েছিল। তো ক্যাসিল্ডা নামের মেয়েটির যাকে বলে সোনার সংসার
ছিল। সে নিজে ছিল রূপসী, তার স্বামী তাকে অত্যধিক ভালবাসত, নিজের ছিল একটি
সুন্দর ফুটফুটে সন্তান, এছাড়া তার মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ার দরুণ সে দিকেও তার
প্রতি ভালবাসার কোন খামতি ছিলোনা। মোট কথা ক্যাসিল্ডা ছিল সকলের ভালবাসার ও
স্নেহের পাত্রী। কিন্তু............ ভালোবাসা, স্নেহ এসব
দৈবিক জিনিষ সে পর্যাপ্ত পরিমাণে পেলেও তার মনে ছিলোনা শান্তি । সে সর্বদা
সন্দেহের চোখে দেখত সকলকে। শুধু ভাবত তার সংসারের এই আনন্দ যেন বাকি সকলে গ্রাস
করতে চায়। তবে এই সন্দেহের মূলে ছিল তার স্বামী। সে মনে মনে স্বামীর তার
প্রতি তীব্র ভালবাসার মধ্যেও গন্ধ পেত সন্দেহের। তার শুধুই মনে হত সকলে যেন
তার স্বামীকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। আর সন্দেহের জাল ধীরে ধীরে তাকে পূর্ণ
রূপে কখন যে গ্রাস করে নিয়েছিল, সে নিজেও টের পায়নি।
যেহেতু এটি গল্প নয় প্রবন্ধ তাই পাঠকদের অতিরঞ্জিত কিছু বলব
না। তাই ক্যাসিল্ডা/লুস্ মারিয়ার ব্যাপারে বলা ছাড়াও জানিয়ে রাখি এই লোক কথার বাকি
চরিত্রদের নাম।
মূল চরিত্র- ক্যাসিল্ডা/লুস্ মারিয়া
তার মা (নাম কোথাও স্পষ্ট উল্লেখ নেই)
হোশে লুইস (লুস্ মারিয়ার স্বামী)
গ্রেগারিও (লুস্ মারিয়ার মায়ের দেখাশুনা করার লোক/ পাশাপাশি
তার বাল্য পরিচিত এবং গোপন প্রেমিক)
পরিশেষে লুস্ মারিয়ার একমাত্র সন্তান। যে বর্ণনা ক্রমে
নেহাতই শিশু
নিজের স্বামীর প্রতি তার অগাধ প্রেম ছিল। আর সেই প্রেম
ক্রমে সঞ্চার করেছিল এক ভয়ের। সবকিছু হারানোর ভয়ের। নিজের প্রিয় মানুষটির প্রতি
ধীরে ধীরে না চাইতেই তার মনে দলা পেকেছিল সন্দেহের। ক্যাসিল্ডার এই সন্দেহের কথা
আর কারোর চোখ এড়িয়ে গেলেও গ্রেগারিওর চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। সে পূর্বে
ক্যাসিল্ডার প্রতি তার দুর্বলতার কথা জানালেও ক্যাসিল্ডা তার প্রতি কোনরূপ
ভ্রূক্ষেপ করেনি। উল্টে ক্যাসিল্ডার হোশের প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের মিষ্টি
শিশুটিকে দেখে গ্রেগারিও মনে মনে জ্বলত। সে শুধু চাইত তাদের এই ভালবাসায় ভাঙন
ধরানোর। বিভিন্ন জায়গায় এর সঠিক কারণ না বলা হলেও একথা এড়িয়ে যাওয়া যায়না যে
গ্রেগারিও, ক্যাসিল্ডার মায়ের পরিচারক হওয়ার পিছনে ছিল তার গোপন
অভিসন্ধির কথা। হয়ত সে ক্যাসিল্ডাকে ফিরে পাওয়ার এক গোপন বাসনার জন্যই একাজ করত।
এদিকে হোশে লুইস ছিলেন একজন সুপুরুষ ব্যাক্তি। তার ভদ্র
আচরণ হোক কিংবা তার রূপ, সকলকেই তিনি বেশ সহজেই আকর্ষিক করত । আর এই থেকে সূত্রপাত
হয় সন্দেহের। এই সন্দেহের বীজ বপন হলে গ্রেগারিও তাতে ঘৃতাহুতি দিতে থাকে সময়
সুযোগ বুঝে। ক্যাসিল্ডা যখনই একাকী থাকে তখনই সে চেষ্টা করতে থাকে হোশের ব্যাপারে
তাকে মিথ্যে কথা বলে তার মন বিষিয়ে দিতে। কিন্তু সে কিছুতেই সফল হতে পারেনা।
সন্দেহের সৃষ্টি সে করতে পারলেও তাদের সম্পর্কের ভাঙন ধরাতে পারছিল না। আর তখনই
একদিন তার মাথায় এক অতি কুচক্রী বুদ্ধি খেলে যায়। সে ক্যাসিল্ডাকে জানায় যে তার
স্বামী এক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত। একথা শুনে ক্যাসিল্ডার মনে এক তীব্র
রোষের সৃষ্টি হয় আর সে গ্রেগারিওকে কুকথা বলতে থাকে। কিন্তু না। গ্রেগারিও সেদিন
আগেই তৈরি ছিল। সে তাকে নিরস্ত্র করে বলে সে যা বলেছে তা পুরোপুরি সত্যি, কারণ সে তা
নিজের চোখে দেখেছে। রাগে ক্যাসিল্ডা তখন দিকবিদিক শূন্য। সে জানতে চায় কে সে সেই
নারী, যে তার স্বামীকে তার কাছ থেকে কাড়িয়ে নিয়েছে ?
উত্তরে কুচক্রী গ্রেগারিও জানায় তার নিজের মা।
এই উত্তরের জন্য ক্যাসিল্ডা মোটেও তৈরি ছিলনা। সে এই
অপ্রত্যাশিত উত্তরে মুহূর্তের জন্য নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। এদিকে গ্রেগারিও
তার মায়ের পরিচারক তাই সন্দেহের অবকাশ ছিলোনা তার কাছে। রাগে,অভিমানে,ক্ষোভে
ক্যাসিল্ডা এবার যা করে তার জন্যই সেই ঘটনা রুপকথার রূপ নেয়। অযাচিত সন্দেহের থেকে
সৃষ্ট এই রোষে তার মনে জন্ম দেয় শয়তানের। সে রাগে নিজের শিশু ও স্বামীকে হত্যা করে। তারপর
নিজের মাকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। জ্বলন্ত শিখায় তার মা চিৎকার করে বলে যে,
সে যা ভেবেছে সব ভুল। বরং এই সব প্রেগারিও-র অভিসন্ধি। সে এক অপরিচিত
ব্যাক্তির কথায় আজ নিজের প্রিয়জনদের হত্যা করেছে। মরার পূর্বে ক্যাসিল্ডাকে তিনি
ঈশ্বরের নাম নিয়ে শাপ দেন যেন সে মৃত্যুর পর মুক্তি না পায়। তার এই সন্দেহ যেন
যুগে যুগে তাকে নিরন্তর যন্ত্রণা দেয় এবং সে যেন সত্যিকারের ব্যাভিচারী পুরুষদের
দণ্ড দেয়। যাতে আর ভবিষ্যতে কোন সন্দেহের জন্য কারোর পরিবার ভেঙে না যায়।
ভেনেজুয়েলাতে কলোনিয়াল পিরিয়ডে মহিলাদের এক ধরণের পোশাক
পাওয়া যেত। যাকে বলা হত সায়োনা। এই শাপ পাওয়ার মুহূর্তেও হয়ত ক্যাসিল্ডা সেই পোশাক
পরেছিল। যার থেকেই এই রুপকথার নারীর এইরূপ নামকরণ হয়।
লা সায়োনা এক অতৃপ্ত প্রেত যে জীবন দশায় নিজের পরিবারের
মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু অভিশাপে সে হয়ে ওঠে ব্যাভিচারে লিপ্ত পুরুষদের কাল হয়ে
। নিজের সঙ্গিনীকে ফাঁকি দিলে সে আবির্ভূত হয় এবং নিজের অপরূপ সৌন্দর্যে আকৃষ্ট
করে সেই সব পুরুষদের। আজও সেখানে এটা মানা হয় ফাঁকা রাস্তায় কোন সুন্দরী নারী
সিগারেট বা লিফট চাইলে অতি দ্রুত সেই স্থান যেন সে ত্যাগ করে। এমন কি সে পিছন থেকে
ডাকলে ভুলেও যেন তাকে সাড়া না দেয়।
তাই উপসংহারে এটাই বলা দরকার সন্দেহ হল ভালবাসার ভাঙন। এ
জিনিস থেকে নিজেকে দূরে রাখাই শ্রেয়। পাশাপাশি ধূমপান
পরিত্যাগ করা দরকার যাতে কেউ সিগারেট কিংবা সিগার চাইলে মুচকি হেসে কেটে পড়তে পারেন।
আর হ্যাঁ সবশেষে “ ভুলেও সায়োনাকে উত্তর দিওনা”।
![]() |
| দেবদত্ত চট্টরাজ ( বাঁকুড়া ) |

আপনারা যারা ওনার লেখা পড়লেন তারা দয়া করে তাদের মূল্যবান মতামত এখানে কমেন্ট বক্সে দিয়ে যান।
ReplyDeleteধন্যবাদ।
সম্পাদক
সাহিত্যের সন্ধানে পত্রিকা