মুক্তগদ্য
" ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লও সহজে৷ "
ভার্চুয়াল পৃথিবী আজ সবচেয়ে বড় বাস্তব। দূরকে করেছে নিকটে ও
নিকটকে দূরে। সোশ্যাল হওয়ার দৌড়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে ঘরের পাশের বাড়ির
মানুষটির খবর রাখিনা। বাড়ির সদস্যদের একসঙ্গে বসে বার্তালাপ করা বন্ধ হয়েছে কবেই,
চিঠি লেখা স্থান পেতে চলেছে আর্কাইভে।
ভার্চুয়াল জগতের সুফল ও কুফল দুইই আমরা দেখতে পাবো এই
প্রবন্ধের মাধ্যমে। চলুন কিছু উদাহরণ দিয়ে দেখে নেওয়া যাক ব্যাপারখানা।
রূপালী জটিল অসুখে আক্রান্ত। বাবা - মায়ের আর্থিক দুরবস্থার
জন্য সঠিক সময়ে তার পর্যাপ্ত চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। ফলতঃ রোগ জটিলতর হয়েছে৷ একদিন
খুব সিরিয়াস অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হলো একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে। পর্যবেক্ষণ
করে ডাক্তারবাবু নিদান দিলেন, অপারেশন করতে হবে। অথৈ জলে পড়লেন মা - বাবা, চিকিৎসার খরচ
যে বিশাল! ক্রন্দনরত হতবিহ্বল বাবা - মায়ের অবস্থাটি এক সহৃদয় মানুষ পোস্ট করলেন
সোশ্যাল মিডিয়ায়। এগিয়ে এলেন অনেকে, শুরু হলো " সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাউড ফান্ডিং
"। অনেক ভালো মানুষ, নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সাহিত্যগোষ্ঠী
এগিয়ে এলো ক্রাউড ফান্ডিং এ। বললে বিশ্বাস করবেন না, মাত্র পনেরো
দিনে জোগাড় হলো অপারেশনের পর্যাপ্ত অর্থ, এমনকি অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসা ও ওষুধের খরচের
দায়ও নিয়ে নিলেন সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষগুলো। জোগাড় হলো রক্তও। রূপালী আজ ভালো আছে,
সোশ্যাল মিডিয়া দিয়েছে তাকে নতুন জীবন, ভার্চুয়াল
পৃথিবী তার কাছে আশীর্বাদস্বরূপ।
কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই কি তাই? চলুন দেখে নিই
আরেকটি উদাহরণ।
প্রেরণা একজন উঠতি সাহিত্যিক, সোশ্যাল
মিডিয়ার দৌলতেই বেশ পরিচিত মুখ। বেশ কিছু বন্ধুও জুটেছে তার ভার্চুয়ালে, তাদের মধ্যে
একজনের সঙ্গে গড়ে উঠেছে অন্তরঙ্গতা। সেই বন্ধুর সঙ্গে সে শেয়ার করেছে কিছু গোপন
কথা, যা সে বলতে পারেনি বাবা - মাকে। বেশ গড়াচ্ছিল দিন, তাল কাটলো
বন্ধুত্ববিচ্ছেদের পর। একদিন সকালে উঠে প্রেরণা আবিষ্কার করলো তার গোপন কথাগুলি
স্ক্রিনশট হয়ে জ্বলজ্বল করছে সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে, চলছে তার
বিশ্লেষণ, হাসাহাসি - ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য। নরম হৃদয়ের প্রেরণা এইসব
মেনে নিতে পারলোনা, শিকার হলো ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের। তারপরে একদিন পৃথিবীর
মায়া ত্যাগ করে গলায় রশি বেঁধে ঝুলে পড়লো সে, তার পরিবারের
কাছে ভার্চুয়াল পৃথিবী হয়ে দাঁড়ালো মূর্তিমান অভিশাপ।
বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রতিটি ভালো আবিষ্কারের সঙ্গে কিছু মন্দও জড়িয়ে
থাকে। ভার্চুয়াল পৃথিবীও তার ব্যতিক্রম নয়। ভালো গ্রহণ করবেন নাকি মন্দ সেটা
সম্পূর্ণ মানুষের দায়িত্ব। ভার্চুয়াল পৃথিবী এক ক্লিকে গোটা দুনিয়াকে এনে দিয়েছে
হাতের মুঠোয়, মানুষের জীবনে যা বিপ্লবের সৃষ্টি করেছে৷ কিন্তু স্রোতের
সঙ্গে আগাছার মত ভেসে এসেছে কিছু খারাপ মানুষ, যারা আপনার
একটি খুঁত খুঁজে পেলে আপনার জীবন দুর্বিষহ করার আগে দুইবারও চিন্তা করে না।
নরদেবতাও যেমন এখানে প্রাসঙ্গিক তেমনি নররাক্ষসও। কাকে বাছবেন সেটি আপনার
বিচারশক্তির ওপরে নির্ভরশীল।
তাই, আমাদের উচিত, ভার্চুয়ালের সঙ্গে বাস্তবকেও প্রাধান্য দেওয়া৷
মুখোমুখি কথার কোনো বিকল্প নেই, হতে পারে না৷ তাই ভার্চুয়াল জগতে না মজে পরিবার ও পুরাতন
বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন, বিপদে পড়লে
মুখোমুখি বসে কথা বলার স্পেসটুকু রাখুন৷ সোশ্যাল মিডিয়া বুল্যিকে সিরিয়াসলি নেবেন
না, ভেঙেও পড়বেননা৷ মনে রাখবেন, মানুষ আজকের পড়া সংবাদ আগামীকাল মনেও রাখেনা৷ তাই শক্ত হোন,
ভার্চুয়াল জগতকে ভালো কাজে ব্যবহার করুন, ব্যক্তিগত বিষয়
সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা পরিহার করুন৷ আর আগাছা কিভাবে দূরীকরণ করতে হয়, সে বিষয়ে
স্রোতস্বিনীকে বলে দিতে হয়না তাইনা! জীবনের আরেক নাম তো নদী।।
![]() |
| রিয়া ভট্টাচার্য ( খড়্গপুর ) |

আপনারা যারা ওনার লেখা পড়লেন তারা দয়া করে তাদের মূল্যবান মতামত এখানে কমেন্ট বক্সে দিয়ে যান।
ReplyDeleteধন্যবাদ।
সম্পাদক
সাহিত্যের সন্ধানে পত্রিকা
খুব ভালো লাগলো দিদির লেখা
ReplyDelete