মুক্তগদ্য
আগে আমার এক বান্ধবীর মেয়ে কে কথা দিয়েছিলাম ও'কে নিয়ে কিছু
লিখবো। আজ সেই সুযোগ পেলাম। ওকে জানাতেই খুশিতে আত্মহারা। অবশ্য 'ও' সব সময় আমাকে
পেলে বা আমার ফোন পেলে ভীষণ খুশি। তাই WhatsApp মারফত পাঠিয়ে
দিলাম একগুচ্ছ প্রশ্ন। সাথে সাথেই ফোন এল " Aunty আমি লিখতে
পারবো না, তুমি লিখে দাও।"
কি করি?
তাই ওর সাথে ফোনেই অনেক্ষণ কথা বলে লিখতে বসলাম।
নামটি ভীষণ সুন্দর - 'শৈল'। ভালো নাম স্নেহলতা চক্রবর্তী। এই বছর ক্লাস নাইনে উঠল। হঠাৎ এবার দেশে মহামারীর করোনা দাগা দেওয়াতে সরকার থেকে ঘোষণা হয় "এবার
সবাই পাশ "।
যদিও সবাই নাকি ওকে বলে "তুই বেচে গেলি"। কেন এমন
কথা বলল সেটি তার জানা নেই।
শৈলর এখন মনখারাপ। লক-ডাউন এর পর স্কুল খুললে তাকে অন্য
একটি নতুন স্কুলে যেতে হবে। তার সঠিক কারণও জানা নেই, শুধু মা বলেছে
আর অঙ্ক করতে হবে না।
পুরোনো স্কুল থেকে তার নামটি কাটা হয়েছে এবং এখন সে নতুন
স্কুলেই অনলাইনে এ ক্লাস করে। এখানে সবাই অচেনা ম্যাম। সবাই ভালো।
ওর কাছে অবশ্য সবাই, সব সময় ভালো।
কিন্তু ও কিছুতেই বুঝতে পারে না , কেন ও নিজের
স্কুলে আর যাবে না?
আপাতত ও যা যা বলল তার মধ্যে সব থেকে বেশি
"মন-খারাপ" নিয়ে বলে গেল। এর বেশি আর নতুন কিছু জানা গেল না।
কিন্তু আজ আমাদের এই আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু 'শৈল'।
তাই আমি ওর গল্পটি বলি।
শৈল নামটি যেমন সুন্দর তেমনি সে নিজেও অপরূপ সুন্দরী।
সে তার বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা । দাদানের প্রথম ও বড়
নাতনী। আর দিদুনের প্রিয় বন্ধু। ছোটবেলাটা বেশ কাটল। ভীষণ হাসি খুশি।
নার্সারি থেকে একটা সমস্যা শুরু হল। সমস্যাটি ধরলেন ওর
নার্সারি স্কুলের এক ম্যাম। তিনি জানান যে শৈলর কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে। কিছু মনে
রাখতে পারছে না। বিশেষ করে সংখ্যা দেখলে কেমন ঘাবড়ে যায়। তাঁরা চিকিৎসার পরামর্শ
দেন।
তারপর শুরু হলো ওকে নিয়ে বাবা-মায়ের
যুদ্ধ। প্রায় কলকাতা শহরে সব নাম করা Child Specialist দের পরামর্শ
নেন। তাঁরা বললেন শৈল একদম শারীরিক ভাবে সুস্থ। তবে অনেকেই Child
Psychologist এর পরামর্শ নিতে বলেন।
মা-বাবা তাই দেখালেন। অনেক প্রশ্ন উত্তরের মাঝে পরতে হয়
ছোট্ট শৈলকে। মা, বাবা, দাদু, দিদাও বাদ পরেননি । শৈল কিছুতেই বোঝে না কারা কেন তাকে এত
প্রশ্ন করে? আবার কেউ কেউ লিখতে কেন দেয়? ছবিও আঁকতে
দেওয়া হয় কেন? ও যেটুকু পারে বলে বা লেখে, আঁকে যা পারে ,
না পারলে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখে।
কিন্তু মা আর বাবার মনে যে কি সাংঘাতিক ঝড় উঠল সে তার টের
এখনো পেল না।
জানা গেল , শৈলর নাকি IQ ( Intelligence Quotient) ওর বয়সি
বাচ্চাদের তুলনায় অনেকটা কম। এই IQ কি ভাবে বা কবে বাড়বে কেউ জানে না। কিন্তু আবার
ডাক্তারি মতে Special Child ও সে না।
তাই সে নর্মাল স্কুলে যেতে পারবে। শৈল আবার আগের মতন স্কুল
যাওয়া শুরু করল। ওর মা স্কুল কর্তৃপক্ষদের সাথে আলোচনা করলেন। তারপর সিধান্ত হল যে
ওর জন্য আলাদা করে প্রশ্ন পত্র তৈরি হবে। তাতে ও যে খুব একটা বেশি পারত তাও না।
এবার সে Play স্কুল ছেড়ে High স্কুলে গেল।
সেখানে আগেই তার সমস্যার কথা জানানো হয়, এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায় তাঁরা যথা সাধ্য
চেষ্টা করবেন।
শহরের খুব নামিদামি স্কুলে এখন শৈল পড়ে।
এবার শুরু হল শৈলর নিজের সমস্যা। যদিও সে, সমস্যা কি ,
তাই বোঝে না।
সে যেহেতু পড়াশোনাটা পারেনা ঠিক মতন তাই কেউ তার বন্ধু হতে
চায়না না। কিন্তু ও প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে বন্ধু বানাবার। সহপাঠীরা ওকে এড়িয়ে
চলে। কিন্তু কেন? তা সে জানে না। কোনো কোনো সহপাঠী রীতি মতো অকারণেই মজা
পাওয়ার জন্য মারধর করে। তাদের সাথে সাধারণ কথা বলতে গেলেই তারা খারাপ ভাষা ব্যবহার
করে কথাও বলে। শৈল সেই সব খারাপ ভাষা আগে শোনেনি, তাই মানেও বোঝে
না, শুধু মাকে, মানে জিজ্ঞেস করতো। কেউ মারলে বা খারাপ কথা বললে , তাকে ও গিয়ে
মারবে, বা তাকে ও কিছু খারাপ মন্তব্য করবে সেই শিক্ষা সে পায়নি। শুধু বাড়ি এসে মা আর
দিদুনকে সব বলতো। মা আর দিদুন দুজনেই বলতো "সবাই ভালো"। "সবাই
বন্ধু"। "একদিন সবাই ওর বন্ধু হয়ে যাবে ঠিক"। তাই সেও অপেক্ষা করে
চেষ্টা চালিয়ে যেত। আর সাথে চলত পড়াশোনার নিয়ে যুদ্ধও। কিছুতেই
সামান্য অঙ্ক করতে সে পারে না। আজ পড়লে, পরের দিন সে পড়া মনে রাখতে পারে না । মাঝে মাঝে
অঙ্ক পরীক্ষায় এক বা দুই পায়। অন্য বিভাগ গুলিতেও খুব একটা ভালো
নম্বর আসে না। কারণ ও যা পড়ে, কিছুক্ষণ পরই সেটা একদম ভুলে যায়। ওর তখন মনে হয় সেগুলো সে
কোনোদিন চোখেই দেখেনি। যদিও ওর জন্য আলাদা প্রশ্ন পত্র আসত, তাও অসুবিধে
রয়েই গেল।
এবার যেহেতু ওর জন্য সব আলাদা 'প্রশ্ন'
বানানো হত, তাই ওর সহপাঠীরা ওকে আরো হেও করতে আরম্ভ করে এবং এড়িয়ে চলার
সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকল, তেমনি অযথা মারধরও চলতে থাকল।
অদ্ভুত বেশ কিছু নতুন শিক্ষিকা বা শিক্ষকরা জানেন না কি
ভাবে সব রকম ছাত্র-ছাত্রীদের সামলাতে হবে। তাঁদের সে ধৈর্যই নেই। ডে বোর্ডিং
স্কুলের বাচ্চারা দিনের বেশীটাই স্কুলে কাটায়, ফলে
শিক্ষক-শিক্ষিকা দের এটা একটি বেশ বড় দায়িত্ব এদের চরিত্র গঠন করা। এই নিয়ে
অনেকবার ওর অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ আলোচনায়ে বসেন। কিন্তু কোনো সুরাহা হয় না।
কিন্তু শৈলই বা আর কতদিন সহ্য করবে এরকম অযথা মারধর। এমনকি
কেউ ওর পাশেই বসতে চায় না। এবার সেও পাল্টা মারতে শুরু করল, যেটা সে আগে
কোনোদিন করেনি কিন্তু কিছু ধূর্ত সহপাঠীরা সব দোষ শৈলের উপর চাপিয়ে দিত। আর সে
নিজেকে যুক্তি দিয়ে তর্ক করতে পারত না। তাই প্রমাণ ও হত না আসল দোষী কারা।
সে এখন ক্লাস নাইনে উঠেছে। এবার যেহেতু ও অঙ্কটা পারছে না
একদম, তাই স্কুল বদলাতে হবে। তাকে এমন স্কুলে দেওয়া হবে যেখানে অঙ্কের জায়গায় অন্য
একটা কিছু নিয়ে পড়তে পারবে।।
এবার বুঝলে তো তোমাদের এই বন্ধুটির সমস্যা কোথায়?
এবার আমি আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে শৈলকে যেমন চিনি জানি বুঝি
সেটি বলি।
শৈল আমার কাছে এক অদ্ভুত সবুজ সতেজ প্রাণ। ও যেকোন,
মানুষকে, বড় হোক বা ছোট , এক নিমেষে আপন করতে পারে। আর না হলেও চেষ্টা
চালিয়ে যায়। ও জানে না ওর কি সমস্যা। কেন সমস্যা। ও গুলো যে একটা সমস্যা
ও সেটাও বোঝেনা।
আমার মেয়ের সহপাঠী সে। আর ওর মা আমার খুব কাছের একজন। আমি নির্দ্বিধায়
বলতে পারি আমার মেয়ে ওকে বন্ধু ভাবে না। কিন্তু আমি শৈলকে বন্ধু বানিয়ে ফেলেছি,
বা বলতে পার ওর আমার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আমায় বাধ্য করেছে ওকে ভালোবাসতে।
কোনো দয়া করে না। ওর প্রতি কেমন যেন একটা ভাষাহীন ভালোবাসা এসে গেছে। এবং এটা
লক্ষ্য করেছি ও ঠিক আমাকে চিনেছে। তাই ও আমার মেয়ে কে এড়িয়ে চলে ( যদিও ফোন করলেই
খোঁজ নেয়) যেটা আমার মেয়ে নেয় না এবং আমাকে ও নিজের সমবয়সী মনে করে সব গোপন কথা
বলে।
এখন এরাই তো আমাদের বন্ধু। কারণ সব মেয়েরা একটু বড় হলেই
মায়েদের বন্ধু হয়ে যায়।
শৈল কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয় ও এসব নিয়ে বেশ চিন্তিত যাকে
তোমরা "DEPRESSED" বলে থাকো। ওর সহপাঠীরা যারা ওকে এত রকম ভাবে উত্যক্ত করে
গেছে দিনের পর দিন তাদের আর দেখতে পাবে না বলে মন খারাপ করে। স্কুলকে খুব
ভালোবাসে। যেই শিক্ষক বা শিক্ষিকারা ওর পাশেই থাকেননি, ও তাঁদেরকে আর
দেখতে পাবেনা বলে কষ্ট পায়।
ওর মা কিছুদিন আগে আমায় বলে সে নাকি, একলা ঘরে
নিজেকেই জিজ্ঞেস করে ওর কি সমস্যা? কি হয়েছে ওর?
কেন কোনো বন্ধু নেই? কেন হঠাৎ স্কুল বদল হবে?
বোঝাই যায় ওর মধ্যে প্রশ্নের পাহাড় তৈরি হয়েছে এত বছর ধরে।
এবার বুঝতে পারছো তো মানুষ নিজের থেকে Depressed হয় না। আমরা
বানাই। আর এদিকে
আমরা Depression নিয়ে এত বড় বড়
কথা বলি।
কিছুদিন আগে চলচ্চিত্র জগতের এক নক্ষত্র , নাম সুশান্ত
সিংহ রাজপুত এই Depression নামক অসুখের শিকার হয়ে আত্মঘাতী হলেন। শোনা গেল সে নাকি
"নিঃসঙ্গ" ছিলেন। আর তারপর থেকে আজ অবধি সোশ্যাল মিডিয়া তে জ্ঞানের
বন্যা বয়ে চলেছে। টিনএজাররা মানে এই আমার মেয়ের বয়সী সকলেই এর বিরুদ্ধে। স্লোগান
" WE NEED JUSTICE FOR SUSHANT" ।
জ্ঞানদাতারা বলছেন সবাই সবার সাথে মেশো, কথা বলো
ইত্যাদি ইত্যাদি।
এবার বলো তো , এই তোমাদের বন্ধুটি কে তোমরা এত জেনেও কেন একলা
বানিয়ে রাখলে? তার ১৫ বছর বয়সে সে একটা 'BEST FRIEND ' তো দূরের কথা
একটা FRIEND: বানাতে পারল না। ওর ভবিষ্যতটা তাহলে ভাব তো কতটা একলা হবে?
এর কি পরিণাম হতে পারে?
আর সব অভিভাবকদেরকে বলি সোশ্যাল মিডিয়াতে এত জ্ঞান না দিয়ে
নিজের বাড়ির ছেলে মেয়েকে একটু বোঝান এবং নিজেও বুঝুন। আগে আপনার চারপাশের মানুষ
গুলো বা এই শৈলের মতন সমস্যায় থাকা টিনএজারদের সাথে একটু কথা বলুন।
আজকালকার শিক্ষক-শিক্ষিদের একটি অনুরোধ আমাদের এই
সন্তানগুলি আপনাদের অনেক শ্রদ্ধা করে, চাইব আপনারা একটু ধৈর্য নিয়ে এদের সবার পাশে
থাকুন।
আমি নিজেও দোষী।
আমার মেয়েকে অনেক বোঝাই তাও সে শৈলকে বন্ধু বানাতে সক্ষম
হয়নি । তার অবশ্য অনেক কারণ। আমার মেয়ে অন্তর্মূখী। দুতিন জনের বেশি বন্ধু তার
লিস্টে নেই, কিন্তু সে শৈলের সাথে কোনরকম দুর্ব্যবহার করেনি।
আমার মেয়ে শৈলকে বন্ধু মানে না কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় শৈলের মাকে সে নিজের
মনের কথা বলে।
আর আমি শৈলের মনের কথা শুনি।
অবাক হবে শুনে, তোমরা যা কাজ স্বপ্নেও করতে পারোনা সেই কাজ শৈল
পারে এবং নিখুঁত ভাবে পারে।
সে নিখুঁত ভাবে যেকোনো প্রাণীকে ভালোবাসতে পারে, অসীম ধৈর্য
রাখতে পারে, সবাইকে সন্মান দিতে জানে, মাকে সম্মান
এবং মা'এর সব কথা অক্ষরে অক্ষরে শোনে, সুন্দর ছবি আঁকে, সুন্দর যোগব্যায়াম করে, সুন্দর গান করে
। যেনে অবাক হবে দিনে সে মাত্র এক ঘন্টার মতন স্মার্টফোন ব্যাবহার করে, কারণ তার মায়ের
এটা নির্দেশ। এই অনলাইন স্কুলের যুগে, যখন তোমরা পায়ের ওপর পাটি তুলে টিভি বা মোবাইলে
ব্যস্ত থাকো, তখন সে তার মা'কে নানা রকম ভাবে ঘরের কাজে সাহায্য করে। সে এর
মধ্যে রুটি করা শিখে গেছে এবং দিনে চারটি রুটি বানিয়ে দেয়, যাতে মায়ের
কষ্টটা একটু কমে। এবং সব কটি রুটি গোলও হয়। রবিবার করে বাবার সাথে সকালের জলখাবার
বানায়। সেদিন মাকে ছুটি দেয়।
এবার বলতে পারবে কজনের এতগুলো গুন একসাথে আছে?
পড়াশোনা ভালো করে করো। কারণ তার ওপর তোমাদের ভবিষ্যৎ
নির্ভর।
কিন্তু আগে মানুষ হতে হবে। না হলে জীবনের সব পরীক্ষাতে
শূন্য পাবে।
আর মানুষ হতে গেলে সবার সাথে মানিয়ে গুছিয়ে থাকতে হবে এবং
ভালোবাসতে জানতে হবে। এখন থেকে যদি না ভালোবাসতে পার বা সব বন্ধুদের সাথে
রুচিসম্মত ভাবে ব্যবহার করতে না পার তাহলে, তোমার বয়সীরা
বা এই শৈলের মতন বাচ্চারা অকালেই "Depression" এর শিকার হবে।
সব শেষে একটি পরামর্শ ,:- পারলে
নিঃস্বার্থ ভাবে, অসীম ধৈর্য নিয়ে কি ভাবে ভালোবাসতে হয় সেটা আমার
"শৈল-সুন্দরী" র থেকে শিখে নিও।
সবাই ভালো থেকো।
আর সুস্থ চিন্তা করতে শেখো।
আগামী বছর গুলো সব তোমাদের।
![]() |
| মধুমিতা রায় চৌধুরী মিত্র- কলকাতা |

Khub sundor lekha madhumitadi, ekakitya sustho manush keo asustho kore tole, so called DEPRESSION e bhoriye dei..
ReplyDeleteআপনারা যারা ওনার লেখা পড়লেন তারা দয়া করে তাদের মূল্যবান মতামত এখানে কমেন্ট বক্সে দিয়ে যান।
ReplyDeleteধন্যবাদ।
সম্পাদক
সাহিত্যের সন্ধানে পত্রিকা