মুক্তগদ্য
শ্রী শ্রী ঠাকুরের জন্ম ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৮৩৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী
জেলার আরামবাগ থানার ছোট্ট গ্রাম কামার পুকুরের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে।
ঈশ্বরদী ও অতি ভক্তি পরায়ন পিতা ক্ষদিরাম চট্টপাধ্যায় ও মাতা চন্দ্রমণি
দেবির চতুর্থ ও শেষ সন্তান রামকৃষ্ণ ঠাকুর।
বাল্যকালে শ্রী ঠাকুরকে তাঁর পিতা ও মাতা আদর করে নাম রেখেছিলেন গদাধর।এই
গদাধর সবার কাছে গদাই নামেই অধিক পরিচিত।
বাড়ির সবার থেকে ছোট হওয়ায় সবাই খুব আদর করতেন।
গদাধরের মুখ দেখলেই যেন কোথাও মায়ায় পড়ে যেতেন সবাই।
একেবারেই শিশু অবস্থা থেকেই জাত পাতের ভেদাভেদ তিনি দূর করেছিলেন,যদিও তা কেউ বুঝতে
পারেনি।
এবং ঠাকুর প্রায় সময় তাঁর দাই মায়ের হাতে খাবার খেতেন।
দাই মাকেও তিনি অন্তর থেকে ভালোবাসতেন।
শৈশব থেকেই ঈশ্বরের প্রতি তিনি অগাধ বিশ্বাসী।
কীর্তনীয়াদের পিছু পিছু ঘুরতেন।নানান দেবী দেবতাদের মূর্তি গড়তেন নিজ
হাতে।
নিজও খুব সুন্দর কৃষ্ণ ভজন করতেন বাল্যকাল থেকেই।
বড়দাদা রামেশ্বরকে খুব ভালো বাসতেন।
পড়াশোনাআতে মন বসেনা।কেবলই ঈশ্বরের প্রতি তাঁর এক নেশা।
পিতা ক্ষুদিরামের মৃত্যুর পর রামেশ্বর সঙ্গে করে কোলকাতায় নিয়ে আসে।
কলকাতার এই বাঁধা ধরা নিয়মে চলা জীবন তাঁর মোটেও পছন্দ না।
রামেশ্বর একটি টোলে সংসকৃত ভাষায় শিক্ষা দিতেন।আর পৌরহিত্য করতেন।
কাজে গদাইকে কোন কোন দিন কুঠিরের ঠাকুর সেবা করতে হতো।
এমন সময় কলকাতার জানবাজারের জমিদার গিন্নি রাণী রাসমণীর মা ভবতারিণীর
মন্দিরের পুজারীর খোঁজ চলছে। জমি গণনা মন্দির নির্মাণ থেকে প্রতিষ্ঠার জন্য একজন সৎ
নিষ্ঠাবান পুরোহিতের প্রয়োজন।
লোক মুখে রামেশ্বরের কথা শুনে ওনাকে ডেকে পাঠালেন।
পুরোহিত হিসেবে রামেশ্বর ঠাকুর নিযুক্ত হলেন।
দাদর সঙ্গে গদাইও মায়ের মন্দিরে যাতায়াত করতেন।ধীরে ধীরে দাদার হাতে হাতে
সাহায্য করতে করতে মন্দিরের সমস্ত কাজ মায়ের পূজা অর্চনা সব শিখে গেলেন।
মনটা শিশুদের মতোই চঞ্চল বলে যখন তখন গ্রামের বাড়িতে কামার পুকুরে মায়ের
কাছে চলে যেতেন।
কিন্তু রামেশ্বরের মৃত্যুর পর দায়িত্ব এসে পড়লো গদাইয়ের ওপর। সঙ্গের
সঙ্গী হলো ভাগ্না হৃদয়।
কিন্তু ঠাকুরের খামখেয়ালীপনার জন্য মা ভবতারিনীর সেবার জন্য প্রধান
পুরোহিত হিসেবে অন্য পুরোহিত নির্বাচন করা হলো।
কারণ গদাই ঠাকুর ইচ্ছে মতো কখনো কখনো পুজো করতেন।
রাজ বাড়িতে কিন্তু সবার প্রিয় গদাই ঠাকুর।আর রাণী রাসমনীর প্রিয় গদাই
ঠাকুর।সব সময় বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করেছেন।তাই রাজ বাড়ির বিশেষ পূজা গদাই ঠাকুরের
হাতেই হতো।সে যেকোনো পুরোহিতের পুজোর পালা থাকনা কেন।
সেই কারণে মন্দিরের অনেক পুরোহিতরা অসন্তুষ্ট ছিলেন ঠাকুরের প্রতি।
রাণী রাসমণীর জামাই মথুরামোহন বিশ্বাস নাস্তিক হওয়া সত্বেও কিন্তু গদাই
ঠাকুরকে নিজের ইচ্ছে মতো থাকার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন।
গদাধর ঠাকুর যখন চব্বিশ বছর বয়স তখন হুগলী জেলারই জয়রামবাটীর ব্রাহ্মণ
পরিবারে পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মাতা শ্যামসুন্দরীর মাত্র পাঁচ বৎসরের কন্যা
সারদা মুখোপাধ্যায়ের বিবাহ হয়।
প্রথমে ঠাকুরের উপযুক্ত কন্যার সন্ধান পাওয়া না যাওয়ায় ঠাকুর নিজেই এই
সম্বন্ধের খোঁজ দেন।
বলেন এই কন্যার জন্ম কেবল তাঁর জন্যই জন্ম হয়েছে।
বিবাহের পর মাকে জয়রামবাটিতে রেখেই চলে যান কলকাতায়।
তারপর আঠারো বছর পর মায়ের সাথে সাক্ষাৎ ঠাকুরের।
এই সব থেকে একটু অন্য আলোচনা তুলে ধরলাম।
ঠাকুর রাণী রাসমণীর মুখে বিদ্যাসাগরের মহাশয়েরষকথা অনেক শুনতেন।
বিদ্যাসাগরের নারী মুক্তির কথা শুনেছেন।নারী শিক্ষার কথা শুনেছেন।
বিধবা বিবাহের কথা শুনেছেন।
এমনকি সমাজ বিরোধী পণ্ডিতদের সাথে তেনার বিতর্কের কথা শুনেছেন।
এবং শুনেছেন সনাতন ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়েও বিদ্যাসাগর মহাশয় পূজা
পাঠে তেমন বিশ্বাসী ছিলেননা।
এইসব নানান কথা শুনে বিদ্যাসাগরকে স্বচোখে দেখার খুব স্বাদ জাগে ঠাকুরের।
ঠাকুর একদিন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাড়িতে পশ্চিম মেদিনীপুরের বীর সিংহ
গ্রামে রওনা দিলেন।
গিয়ে বাইরে থেকে বললেন সেই কোলকাতা থেকে এসেছি একটিবার সেই জ্যান্ত
ঈশ্বরের দর্শন করতে।
লোকের মুখে অনেক শুনেছি।একটিবার নিজের চোখে দেখে জীবনটা স্বার্থক করতে
চাই যে গো।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর মনে সন্তুষ্টি ফিরে
যান।
এর মাঝে নাম করা যাত্রাপালার মালিক গিরীশ ঘোষের সাথে পরিচয় হয়।
মাঝে মধ্যেই যেতেনও।তাদের মধ্যে নাম করা অভিনেত্রী বিনোদিনীর সাথে
ঠাকুরের সাক্ষাৎ।এই সাক্ষাৎ নটী বিনোদিনী পালায়।পালা দেখে ঠাকুর মুগ্ধ হয়ে যান।সেই
থেকে তাকে বিনোদ নামেই ডাকেন।গিরীশ ঘোষকে ঠাকুর দীক্ষা দেন।ঠাকুর বলেন গিরীশ দিনে
অন্তত একবার ঈশ্বরের নাম নিও।
নেশায় বিভোর গিরীশ ঘোষ ঠাকুরকে বলেন...ঠাকুর;আমার হাতে সময় নেই
ঠাকুরের নাম তপ জপ করার জন্য।
ঠাকুর বলেছিলেন একদিন এমন সময় আসবে যে তুমি নিজেই ঈশ্বরের কাছে ছুটে যাবে।
এদিকে ঠাকুর নরেন অর্থে নরেন্দ্র নাথ দত্তের অর্থাৎ স্বামী বিবেকানন্দকে
প্রধান শিষ্য হিসেবে বেছে নেন।
দীক্ষা মন্ত্রে মন্ত্রিত করেন।
ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণের লীলা ভজন কীর্তন ভীষণ ভালোবাসতে।তাই মায়ের ভক্তির
সঙ্গে সঙ্গে নিজেও ভজন কীর্তনেও মগ্ন থাকতেন।
মাঝে মাঝেই নৌকা বিহারে বেড়াতেন এবং শ্রী কৃষ্ণের নাম করতেন।
নবদ্বীপে রাণী রাসমণীর সাথে গিয়েছিলেন।মহাপ্রভূর দর্শন করতে।
অন্যদিকে শ্রী শ্রী মাকে মাতৃ রূপে পুজো করতেন।মা যখন সন্তানের ইচ্ছে
প্রকাশ করেন তখন মাকে বলেন তুমি জগত সংসারে সকলের মা।
একদিন তোমার অসংখ্য সন্তান তোমায় মা বলে চারিদিক থেকে ডাকবে।একটা
সন্তানের মা হয়ে কী করবে?
তুমি অজস্র সন্তানের মা হয়ে উঠবে এই বিশ্বে।
মা কোনদিন ঠাকুরের কথার অমান্য করেননি।নিঃস্বার্থ ভাবে ঠাকুরের সেবা করে
গেছেন।
ঠাকুর কোনদিন জাতপাত নিয়ে বিচার করেননি।
সকলকে আপন করে কাছে টেনে নিতেন।
সকলের রোগ ব্যধী নিজর ওপর নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
এমনকি শেষ জীবনে ঠাকুর গলায় ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।
কারণ গিরীশ ঘোষ অত্যাধিক নেশার কারণে গলায় ক্যানসারের রোগে আক্রান্ত হয়ে
পড়ে।আর গিরীশ ঘোষের মধ্যে শিল্পী সত্ত্বা এবং অনেককেই রোজগার দেয় বলে তার বেঁচে
থাকাটা জরুরী মনে করেছিলেন।
এছাড়া জীবনের এই মোড়ে এসে গিরীশ ঘোষ ঈশ্বরের স্মরণাপন্য হয়েছে।তাই
ঈশ্বরের সানিধ্য লাভ করতে দিতে গিয়ে ঠাকুর তেনার শিষ্য গিরীশ ঘোষকে এই রোগ থেকে
মুক্তি দিতে নিজের ওপর রোগটি ধারন করেন।
কিন্তু এই রোগের চিকিৎসা করেও কোন লাভ হয়নি।এক শিষ্যের বাগান বাড়িতে নিয়ে
গিয়ে রাখা হয়।আর এই সময় মা ঠাকুরের সেবা যত্ন করেন।
তার পর ১৮৬৮ সালে ১৬ই আগষ্ট মাত্র ৫০ বৎসর বয়সে ইহোলোক ত্যাগ করে ঈশ্বরে
বিলীন হয়ে যান।
| কবিতা সামন্ত |
আপনারা যারা ওনার লেখা পড়লেন তারা দয়া করে তাদের মূল্যবান মতামত এখানে কমেন্ট বক্সে দিয়ে যান।
ReplyDeleteধন্যবাদ।