Saturday, 17 April 2021

বাংলা সাহিত্যের ধারা - মালিনা ঘোষ

 


প্রবন্ধ

 

       আমাদের ভারতবর্ষ দেশটা যেমন বহু প্রাচীন ,এর সাহিত্য ঠিক ততটাই পুরানো ! আর এই প্রাচীন ভারতের প্রথম সাহিত্য হল  ‘বেদ’। বেদ সাহিত্যের মধ্য দিয়েই তৎকালীন ভারতবর্ষের রূপ সুন্দর ভাবে ফুটে ঠে । সুতরাং, যে কোন সাহিত্যের বিষয়বস্তু হল ভাব এবং ভাষায় তার সুন্দর ভাবে প্রকাশ ! আর ভাবপূর্ণ ভাষাই হল সাহিত্য। আমরা যখন আমাদের মনের ভাবকে সুন্দর করে ভাষায় প্রকাশ করি নিজেকে বা অন্যকে মনোরঞ্জনের জন্য তাকেই বলে সাহিত্য ।

      সাহিত্যের মাধ্যমে আমরা সমস্ত ভেদাভেদ দূর করে একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি তেমনি সাহিত্য সমাজকে সচেতন করে এবং সমাজকে নতুন ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে । এককথায় সাহিত্যকে আমরা মানব সমাজের আয়নাও বলতে পারি ।

       প্রাচীন কালে সাহিত্য ছিল কাব্য কেন্দ্রিকগদ্যেরও যে একটা শ্রী আছে তা সৃষ্টি হতে অনেক বছর সময় লাগে ।লিপি আবিষ্কারের পরই সাহিত্যের প্রকাশ এবং প্রচার হয় জনসাধারনে 

       আমাদের সবার প্রিয় বাংলা সাহিত্যও বহু পুরানো আনুমানিক খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সুচনা হয়তবে তা প্রাচীন বাংলা ভাষা হিসাবে গণ্য করা হলেও আসলে তা ছিল পালী ভাষায় তৎকালীন পূর্ব ভারতীয়রা এই ভাষাতেই সাহিত্য চর্চা করত ।

       লক্ষ্য করলে দেখা যাবে , আমরা বাংলা সাহিত্যকে আলাদা আলাদা যুগে আলাদা আলাদা রূপে পেয়েছি ।সুতরাং এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বাংলা সাহিত্য বিভিন্ন যুগে নানান বিষয় নিয়ে সাহিত্যের সৃষ্টি করেছিলযেমন আদিযুগে ‘চর্যাপদ’ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বৌদ্ধ সহজিয়া কবিগণ এই পদের রচনা করেছিলেন ।এই পদের মাধ্যমে তৎকালীন বাংলার বর্ণনা ও মানুষের আচার-আচরণের পরিচয় পেয়ে থাকি         

       আবার ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ হল সাহিত্যের মধ্যযুগ এই যুগে বাংলা সাহিত্যের পরিসর ছিল সত্যিই বিশাল এবং কাব্যপ্রধান মধ্যযুগের সাহিত্য পাঁচটি শাখায় বিভক্ত ছিল ,যেমন মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণবপদাবলি, চৈতন্যজীবনী, অনুবাদ সাহিত্য এবং শাক্তপদ সাহিত্য তা ছাড়াও ছিল পীর সাহিত্য, বাউল পদাবলি ইত্যাদি ।এই যুগে নানা বিষয়ের ওপর সাহিত্য সৃষ্টি হলেও, বিশেষ করে লৌকিক ও ধর্মবিশ্বাসকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছিল মধ্যযুগের সাহিত্য

       খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সুত্রপাত হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে এক নতুন যুগের সূচনা করে । এই যুগে বাংলা সাহিত্যে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর বদলে মানবতাবাদ ও মানব-মনস্তত্ত্ব প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠে । এই যুগে সাহিত্যের মাধ্যমে ইতিহাস ,প্রবন্ধ ,নাটক, উপন্যাস ও গল্পের সূচনা হয় এবং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্য ।যাদের কলমের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার প্রচলন হয়েছিল তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল রাজা রামমোহন রায় ,ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ,ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ,কথা সাগর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং আরো অনেকে এঁদের বাংলা সাহিত্যের প্রতি অবদান নজরকাড়া'র মত ।

       তবে আধুনিক যুগে বাংলা সাহিত্যে পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশেষ ভূমিকা ছিলতিনি বাংলা ভাষাকে বর্ণ পরিচয়ের মাধ্যমে নতুন রূপ দেন সেই সঙ্গে ‘রবীন্দ্র সাহিত্য’ বাংলা তথা সারা বিশ্বে এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করে ।তাঁর কাব্যে ভাষার জাদু ,ভাব এবং মাধুর্য সবাইকে মুগ্ধ করে দেয় ! এমনকি তাঁর সমসাময়িক সাহিত্যিকদের রচনাতেও বৈচিত্র লক্ষ্যনীয় ছিল ।এই যুগে শিশু সাহিত্যও মানুষের মনে বিশেষ স্থান করে নেয় ।

       কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ফলে বাংলা সাহিত্য দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায় ।কলকাতা কেন্দ্রিক এবং ঢাকা কেন্দ্রিক ! যদিও সাহিত্যের জগত সবসময় বৈশ্বিক ,ভাষা মিলের জন্য তা আরও বেশি সুদৃঢ় হয় এই সময়কার বাংলা সাহিত্যে সমাজের অবহেলিত ,শোষিত ,বঞ্চিত, দারিদ্র  এবং হতাশার দিক গুলো ফুটে ওঠে ।

       আবার একবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে এক অন্য ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ।বললে ভুল হবেনা ,চিরাচরিত চিন্তাধারা থেকে খানিকটা আলাদা । এই সময় বাংলা সাহিত্যে ‘লিটিল ম্যাগাজিন’ এক যুগান্তকারী মাত্রা যোগ করেসৃষ্টি হয় নতুন কবিতার চলন ,ঘটে নতুন ধারার রচনা এবং পরিবর্তন আসে ভাষা ,ছন্দ ও মাত্রার রাজনীতির প্রভাবও দেখা যায় সাহিত্যিক'দের কলমে আগের থেকে অনেক বেশি । হয়ত ভবিষ্যত বাংলা সাহিত্যে যেটার ফল খারাপও হতে পারে !

      তবে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বাংলা সাহিত্য এখন একেবারেই অত্যাধুনিকযদিও এই আধুনিকতার সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন সাহিত্য অনেকটা নদীর স্রোতের মতো ! নদীর গতি পথ যেমন চলতে চলতে হটাতই বাঁক খায় ! এই বাঁকই হল পরিবর্তন বা আধুনিকতা ! পরিবর্তন বা আধুনিকতা কোন সময় মেনে আসেনা ,চলে আপন মর্জিতে !সাহিত্যও ঠিক তাই ! 

      বর্তমানে আমরা সবাই সাহিত্যের নামে বাংলা ভাষার চর্চা তো করছি , কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই বাংলা ভাষার মান অনেকটাই নিম্নমানের । নতুন লেখকেরা মুক্তগদ্য ,গদ্যকবিতা , রম্য রচনার  সঙ্গে  সঙ্গে  নিজের মত করে সাহিত্য সৃষ্টিতে সাচ্ছন্দ বোধ করছে যেটি গতানুগতিক সাহিত্য চিন্তা-ভাবনা থেকে অনেকটাই আলাদা । বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার নামে বেড়েছে অশ্লীল এবং উস্কানি মূলক ভাষার প্রয়োগ সংযোজন হয়েছে নতুন শব্দ এবং বানানে এসেছে নতুনত্ব ! যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকারক এবং বিভ্রান্তিকর

       এখন কথা হচ্ছে কেমন হবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্য! আদৌ তাকে কি সম্পূর্ণ বাংলা সাহিত্য হিসাবে গণ্য করা যাবে, নাকি ককটেল বাংলা সাহিত্য হিসাবে পরিগণিত হবে ? হয়তঃ আমাদের সবার কাছেই সেই প্রশ্নের উত্তর আছে । আমরা জানি ,যে কোন সাহিত্যে পরিবর্তন-শীলতা সেই আদিকাল থেকে হয়ে আসছে ! তা সে ধরন, লেখনী, শৈলী, ভাষা, বিষয় ও চিন্তা ভাবনা সব দিক থেকেই আজও হচ্ছে ,অনেক বছর পরও তা হবে ।আমরা বাংলা ভাষী হিসাবে বাংলাতে কথাও বলব, বইও পড়ব ! সেখানে রবীন্দ্র সাহিত্য, নজরুল সাহিত্য ,জীবনানন্দ বা অন্যান্য বাংলা সাহিত্যের উপস্থিতি থাকবে নিঃসন্দেহে ! কিন্তু লেখনীতে আসবে বৈচিত্র ,সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই ! কারন যে কোন ভাষার সাহিত্য মানে শুধু কথা বলা ,পড়া বা লেখা না ।সেটা মন থেকে ভাবা এবং তাকে  সুন্দর ভাবে প্রকাশ করা । এটাও সত্যি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা লেখকের লেখনীতে বা ভাবনাতে প্রভাব ফেলবে  !

       তবুও বলতে দ্বিধা নেই ভবিষ্যতে যাদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের কলম চলবে তাদের ভাষা জ্ঞান হবে সীমিত ।কারন আজকাল স্কুল গুলোতে বাংলা শিক্ষাব্যবস্থা খুবই দুর্বল এমনকি আমাদের বঙ্গভূমিতে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলি প্রায় বন্ধের মুখে পড়ছে কারন সেখানে বাংলা ভাষা পড়ুয়ার অভাব বলে ।বংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তাও কমেছে প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা ও জীবিকাতে । তথাকথিত শিক্ষিত বাড়িতেও দিন দিন বাংলা ভাষা চর্চার অবনতি ঘটছে ,হয়ত আরো ঘটবে ! তারা বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বা ইংরেজিকে বেছে নিচ্ছে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে ।আর যদি বাংলা ভাষার প্রতি বোধই কমে যায় ,আন্তরিকতা না থাকে তবে সেখানে যাই সৃষ্টি হোক না কেন তার সৌন্দর্য ক্ষীণ হতে বাধ্য !

       আবার এমনও হতে পারে বর্তমান সাহিত্যিক এবং ভবিষ্যৎ সাহিত্যকদের হাত ধরে  বাংলা সাহিত্য তিনটি ধারাই চলবে ;

>প্রথম ধারাটি সম্পূর্ণ ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যকে অনুসরণ করবে !

>দ্বিতীয় ধারাটি হবে অত্যাধুনিক শহরকেন্দ্রিক, যেখানে কাব্যে রাজনীতির প্রভাব হবে বেশী । ভাষায় আসবে নূতন শব্দের প্রচলন যেগুলো বাংলা এবং ইংরেজির সংমিশ্রণ হতে পারে এবং থাকবে পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রয়োগ

 >এবং তৃতীয় ধারাটি হবে শহরতলীর সাহিত্য যেখানে থাকবে নতুনত্বের ছোঁয়া ,থাকবে প্রকৃতির বর্ণনা এবং লৌকিক কথা ।হয়ত এই তৃতীয় ধারাই ভবিষ্যত বাংলা সাহিত্যে নতুনত্বের সূচনা করবে ।

        যেমন বৃত্তের পুনঃরাবৃত্তি হয় ,তেমনি বাংলা সাহিত্যে আবার নতুন বৃত্তের শুরু হবে! ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যে যাই ঘটুক না কেন লেখক এবং পাঠকবর্গকে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে কোনো কিছুর মাত্রারিক্ত সংযোজন যেন না ঘটে। তাতে বাংলা সাহিত্যর অবনতি হতে পারে । বাংলা ভাষী হিসেবে আমাদের কাজ বাংলা সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখা ।সুন্দর ভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।


মালিনা ঘোষ  (কলকাতা )



1 comment:

  1. আপনারা যারা ওনার লেখা পড়লেন তারা দয়া করে তাদের মূল্যবান মতামত এখানে কমেন্ট বক্সে দিয়ে যান।
    ধন্যবাদ।
    সম্পাদক
    সাহিত্যের সন্ধানে পত্রিকা

    ReplyDelete

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...