Friday, 16 April 2021

তাহাদের কথা - পিনাকী বসু



 "   একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?"

"বলো"

ভালোবাসা কাকে বলে ?"

"  হঠাৎ এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন মাথায় এলো   ?  "

"   ট্রাফিক সিগনালেওই যে রবীন্দ্রসংগীতটা বাজছে - তোমরা যে বলো দিবস রজনী ভালোবাসা ভালোবাসা সখি ভালোবাসা কারে কয় তাই জিজ্ঞেস করলাম "

"  ওহ তাই বলো |তবে  ভালোবাসা   সম্পর্কে   আমার ধ্যানধারণা তোমার পছন্দ হবেনা | “

 "কেন ?"

কারণ সেটা প্রথাগত চিন্তাভাবনার সাথে মেলে না -তাই  "

"তুমি তো সব সময়েই উল্টোপাল্টা ভাবো  "

"উল্টোপাল্টা নয়    অন্যরকম "

"বেশ তাই নাহয় হলো ,অন্যরকম |কিন্তু কি ভাবো তা তো   শুনি  ?"

“ শুনবেবেশ তবে শোনো |আমার মনে হয়ভালোবাসা হলো একটা আপেক্ষিক শব্দঅভিধানেও এর কোনো সংজ্ঞা দেয়া  নেই |বিভিন্ন  মানুষের প্রতি বিভিন্ন মানুষের ,বিভিন্ন রকম অভিব্যক্তি দিয়ে এর অর্থ বোঝানো হয় ,যেমন ধরো ,পছন্দ ,স্নেহ ,শ্রদ্ধা ,আসক্তি , প্রণয় ইত্যাদি ইত্যাদি |ভালোবাসার নিজস্ব কোনো স্বরূপ নেই |আমার মতে ভালোবাসা একটা অনির্বচনীয় অনুভূতির প্রকাশ মাত্র রবীন্দ্রনাথের ভাষায়  বলা যায় ,তারে চোখে দেখিনি শুধু বাঁশি শুনেছি "

ধুস , কি যে শক্ত শক্ত কথা বল না |তোমার ওই সাহিত্যের ভাষা আমার মাথায় ঢোকে না |ঠিক করে  বুঝিয়ে বলো না এইযে পথে ঘাটে ,  মাঠে ,পাড়ায় পাড়ায় সব জায়গায় দুজন দুজন করে দেখা যায়,একে অন্যের হাত ধরে হাঁটে জড়িয়ে ধরে অন্ধকারে বসে থাকে | তাছাড়া কতরকম তো শুনি যে, অমুক অমুককে  ভালোবাসে ,অমুকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি ,এগুলো তাহলে কি ?"

"ওগুলো ভালোবাসা নয় |হতে পারেভালোবাসার  চেষ্টা বা  কারো কারো  ক্ষেত্রে অভিনয়ভালোবাসি শব্দটা যখন তখন যেখানে সেখানে উচ্চারণ করা সহজ কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা ব্যাপারটা বেশ জটিল আর বেশ কঠিন ও বটে |ভালোবাসি বললেই বা পাশাপাশি বসে থাকলেই কি ভালোবাসা হয় ? “

"ওগুলো তাহলে কি ?"   

ওগুলোও এক একটা সম্পর্ক বটে  ,তবে এর মধ্যে ভালোবাসা নামক অনুঘটকের  পরিমাণটা বিতর্কিত এবং সম্পর্ক থেকে সম্পর্কের মধ্যে তার আয়তনগত তারতম্য থাকে |তা ছাড়া যে কোনো সম্পর্কই এক সময় মনকে অতিক্রম করে শরীরকে ছুঁতে চায় তার জন্য ভালোবাসা থাকা না থাকাটা অত্যাবশকীয় নয় | "

"স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যেও ভালোবাসা নেই বলতে চাও ?"

দু দুটো স্বতন্ত্র  মানুষ যাদের  নিজের নিজের আলাদা আলাদা  স্বত্বা আছে তাদের মধ্যে ভালোবাসা ?আমার মনে হয় প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে একটা অধিকারবোধ বা দখলদারি অজানাকে জানার একটা চেষ্টা, কিছুটা শারীরিক আকর্ষণ তারপর সমঝোতা ,অনেক সময়ে সন্তানের মুখ চেয়ে মেনে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়া |যারা তা পারে না  তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়|আর যারা কোনোক্রমে টিকে থাকে ভালোবাসা আদৌ তাদের মধ্যে কোনোদিন ছিল কিনা বা কখন তা ডানা মেলে উড়ে গেছে তা তারা টেরও পায় না "

"তুমি না আজকাল বড্ডো হেঁয়ালি করে কথা বলো তোমার কথাগুলো আমার মাথার ওপর দিয়ে যায় সহজ করে বলতে পারছো না ?”

"এর চেয়ে সহজ করে এই জটিল বিষয়ে কি বলবো ?"

আচ্ছা এটা তো মানবে যে  ভালোবাসা শুধু একরকম হয় না  | প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসাই শুধু ভালোবাসা নয় | ভাই,বোন, বন্ধুবান্ধব, পশুপ্রাণী এদের প্রতিও তো মানুষের ভালোবাসা থাকে নাকি? “

"এইসব সম্পর্কগুলো বেশির ভাগ সময়েই   সামাজিক ভাবে বাধ্যতামূলক কিম্বা   প্রয়োজনভিত্তিক এবং পারস্পরিক দেনাপাওনা বা স্বার্থসিদ্ধির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে |অনেকসময় এটা আবার নিজেকে প্রেমিক ,বা মহান বা বন্ধুবৎসল জাহির করার তাগিদ থেকেও তৈরী হয় |"

মা বাবাকে  তো লোকে ভালোবাসে নাকি ?এই যে ধরোপাশের বাড়ির কাকু তার বৃদ্ধা মায়ের এতো সেবা করে এটা কি মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা নয়?"

" ওটা বেশ খানিকটা কর্তব্য বলতে পারো |বোঝা যায় ভদ্রলোক ভালো এবং দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন  |এসব লোকেদের স্ত্রীরাও প্রশংসার দাবি রাখে কারণ তিনি সম্মত না থাকলে ভদ্রলোকের এই মহানুভবতা বা কর্তব্যপরায়ণতা দেখানো সম্ভব হতো না |এখানে ভাবা যেতে পারে যে ভদ্রলোকও স্ত্রীর অনেক কথা মেনে চলেন "

" আচ্ছা যদি উল্টোদিকটার কথা বলি  |কথায় বলে মেয়ের প্রতি বাবার নিস্কাম ভালোবাসা নাকি পৃথিবীর সব থেকে পবিত্র ভালোবাসা ,কিংবা মায়ের ভালোবাসার ঋণ শোধ হয় না  , এইসব বাগধারা গুলো সম্পর্কে তোমার কি অভিমত  ?"

" আসলে আমার মা বাবা খুব ছোটবেলায় মারা গেছেন , তাই ওই সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে মন্তব্য করা বোধহয় আমার ধৃষ্টতা হচ্ছে তবে আশপাশে দেখে শুনে মনে হয় , মা বাবা যেটা করেন সেটা এক তরফা তাই  এটাকে তুমি স্নেহও বলতে পারো এটা সব সময় নিম্নগামী হয় নিজের থেকেও  বেশি কারুর মঙ্গল চাইলে সে আন্তরিকতার  খুব একটা কদর থাকে না বাবা মায়েদের ক্ষেত্রেও সাধারণত তাই হয়তাছাড়া অনেক যত্ন করে পালন করা এই সম্পর্কটা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের  সব থেকে বেশি ঠকায় আর আর তাদের পক্ষে ভালোবাসার নয় যন্ত্রণার হয় | "

সেইজন্যই তো বলে কুপুত্র যদ্যপি হয় কুমাতা কখনো নয় আর বাবাকে তো শাস্ত্রে সব দেবতার উর্দ্ধে স্থান দেয়া হয়েছে হবে নাইবা কেন ,বাবা মায়ের ভালোবাসার ফসল তার সন্তান |বাবা তাকে সৃষ্টি করে , মা নিজের শরীর থেকে তাকে জন্ম দেয় |নিজেদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে, নিজের সন্তানকে তো তারা  ভালোবাসবেই ,এটাই তো স্বাভাবিক | সে সম্পর্কটাকেও তুমি নিখাদ ভালোবাসার নাম দেবে না ? "

"এমনও তো শোনা যায় বাবা তার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে ,বিক্রি করে দিয়েছে ,কোনো মা তার সদ্যজাত সন্তানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে রেখে গেছে কিংবা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে তখন কোথাও একটা বিশ্বাসটা নাড়া খায় বৈকি |"

"এগুলো তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা |হয়তো বা কোনো মজবুরি থেকে এই কাজগুলো করা |"

" তাই তো বলছি এখানেও সম্পর্কটা  প্রশ্নাতীত নয় আর ব্যতিক্রম সব সময় নিয়মকে সিদ্ধ করে |”

"তবে কি তোমার মতে ভালোবাসার সত্যি সত্যি  কোনো অস্তিত্ব নেই ,আমরা কেউ কাউকেই ভালোবাসি না ?"

" তাই হয় নাকি ডিকশনারিতে যখন ঠাঁই পেয়েছে তখন ভালোবাসা নামের কোনো  একটা আবেগের অস্তিত্ব অস্বীকার করি কি করে বলতো ভালোবাসা পৃথিবীতে সব থেকে দামি উপলব্ধিগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি সব থেকে বড় কথা বিজ্ঞান বলছে মানুষের শরীর থেকে নিঃসৃত এন্ট্রস্টেডিএনন ,এবং এনড্রোস্টেনোন এর সাহায্যে মানুষ ভালোবাসা সৃষ্টি করে বিজ্ঞান সম্মত এই সৃষ্টিকে আমি অস্বীকার করি কি করে সব মানুষ ভালোবাসা চায় ,ভালোবাসা খোঁজে ,ভালোবাসা তৈরী করে  কিন্তু এর যোগান চাহিদার চেয়ে সব সময় কম থাকে তাই এটা দুষ্প্রাপ্য বলে   ধরা হয় আর সব থেকে সেরা  জিনিসটা মানুষ সব সময় নিজের জন্য চায় আর তাই  মানুষ নিজেকে সবসময় সব থেকে বেশি ভালোবাসা দেয় | "

যাক তবু  তুমি মানলে যে ভালোবাসা আছে তা তোমার ধ্যান ধারণা অনুযায়ীওতো ভালোবাসার একটা স্বরূপ আঁকা  যেতে পারে ?"

" তা পারে "

" কিরকম সেটা ?"

"দেখবে, সংসারে আমরা নিজেকে সব থেকে  সুখী দেখতে  পছন্দ করি |নিজেকে সব থেকে  শ্রেষ্ঠ বা সবিশেষ  করে অন্যের চোখে তুলে ধরতে পছন্দ করি |আমরা সারাক্ষন  নিজেকে নিয়েই  ভাবিনিজেকে দুঃখ দিতে চাই না সারাক্ষন নিজের জন্য সব থেকে সেরা সুখের সন্ধান করি |নিজের সুখ দুঃখ আনন্দ ব্যাথা বেদনা আমাদের সবথেকে বেশি আনন্দ দেয়, কষ্ট  দেয় আমরা সব সময় নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করি ,ভালো থাকার চেষ্টা করি ভালো খাবার খেতে পছন্দ করি ,ভালো পোশাক পড়তে ,নিজেকে সাজাতে পছন্দ করি |অন্যের কাছে সম্মানিত হতে চাই চাই যে অন্যেরা সব সময় আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করুকআমাদের মনমতো চলুক |আমি যা চাই তা যেন জীবন আমাদের সহজেই সব পাইয়ে দেয় এবং তার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি |আমরা নিজের শর্তে  জীবন কাটাতে বেশি স্বচ্ছন্দ  বোধ করি |এককথায় বলতে পারো   আমরা  নিজেদের ভালোতে বাস করি অর্থাৎ আমরা নিজেদেরকে খুব ভালোবাসি |"    

"তাই যদি হয় তাহলে এই প্রবৃত্তিগুলো যে সব সম্পর্কের মধ্যে থাকবে সেখানে তো ভালোবাসার অস্তিত্ব আছে বলে ধরে নিতে হবে |নিজের মতো বা নিজের থেকেও বেশি কারো ভালো চাইলে তাকে তো ভালোবাসা বলতেই পারি ?"

 “যুক্তিবাদের কাঠিন্য বাদ দিয়ে যদি দেখা যায় তবে দেখবে জীবন এতো হিসেব বা নিয়ম মেনে চলে না |ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট  অংকের  মতো নিয়ম নেই ভালোবাসা নিছক তত্বকথা নয় এটা একটা অনাস্বাদিতপূর্ব আবেগ |জীবনের পথে চলতে চলতে হঠাৎ একদিন আমরা জানতে পারি যে আমি    কাউকে  ভালোবাসি বা আমাকে কেউ ভালোবাসে প্রত্যেক ভালোবাসার একটা নিজস্ব গল্প থাকে যেটা অন্যদের গল্পের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা চারদিকে রাতদিন কত অদ্ভুতধরণের  ভালোবাসার কথা  শোনা যায় পুরুষে পুরুষে ভালোবাসা ,নারীতে নারীতে ভালোবাসা মানুষে পশুতে ভালোবাসা| অসম ভালোবাসার কত বিখ্যাত গল্পই তো পড়েছো |এর কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই |পৃথিবীর কোণে কোণে এরকম কত অজস্র্র ভালোবাসার কাহিনী ছড়িয়ে আছে আমরা তার খবরও   রাখিনা   

আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি না ?"

তোমার কি মনে হয় ?"

প্রশ্নের উত্তর তো প্রশ্ন হয়না এটুকু জানি "

দেখো ,কানের কাছে হাজারবার যদি বলা যায় যে আমি তোমায় ভালোবাসি ,আমি তোমায় ভালোবাসি ,তবে গোয়েবেল থিওরির মতো একসময় হয়তো কথাটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতেও পারে কিন্তু অচিরেই নানা হিসেবনিকেশের ধাক্কায় ধারণাটা বদলেও যেতে পারে অতএব উপলব্ধিটাই আসল তোমার যদি কোনোদিন মনে হয় যে আমরা একে অন্যকে খুব ভালোবাসি তবে সে ধারণাটা অপেক্ষাকৃত পোক্ত হয় কারণ এই উপলব্ধিটা,  অনেক পরীক্ষার সাগর  পার  করে তবে আসে অনেক পাওয়া না পাওয়া ,রাগ অভিমান ,ভুলবোঝাবুঝি পেরিয়ে তবে আসে তাই কষ্টার্জিত সেই অনুভূতির স্থায়িত্ব ও বেশি হয় |এই উপলব্ধি আসতে অবশ্য অনেকটা সময় লাগে "

"এর ও সময় লাগে কতটা সময় ?"

কমপক্ষে দশ বছর "

আচ্ছা আমাদের সম্পর্ক কত বছরের ?"

এই পয়লা জানুয়ারিতে পাঁচ বছর পূর্ণ  হবে  |"

তোমার মনে আছে আমাদের প্রথম আলাপের কথা  ?"

হ্যাঁ , যথেষ্ট মনে আছে যার হাত ধরে তুমি অনাথাশ্রম ছেড়েছিলে সে তোমায় ছেড়ে চলে গেছিলো অনাথাশ্রমে তোমার আর জায়গা হয়নি |অশ্রয়হীনা তুমি , নিঃসঙ্গতার উপলব্ধিতে ,বিশ্বাস ভাঙার দুঃখে, আত্মহত্যা করতে চাইছিলে সেই সময় তোমার সাথে আমার আলাপ " 

"মনে আছে তোমার ?   সেই দিনগুলোর কথা আমি জীবনেও ভুলবো না|মাঝে মাঝে মনে হয় , তুমি সেদিন না থাকলে যে কি হতো আসলে কি জানো  তো , যাদের যোগ্যতা নেই তাদের ভালোবাসা উচিত নয় |তুমি কিন্তু তারপর থেকে একটা দিন ও আমার হাত ছাড়োনি একটা মুহূর্তও আমায় একা থাকতে দাওনি | "

তাই নাকি আমি এরকম করেছি ?"

তোমার মনে আছে আমি যখন বিষ খেয়েছিলাম তুমি আমায় তোমার বন্ধুর নার্সিংহোমে   নিয়ে গেছিলে |  সে  তোমার কি  টেনশন আর যখন আমি একটু ধাতস্থ হলাম তোমার মুখের সেই হাসিটা আমি কোনোদিন ভুলবোনা |"

 

হেসেছিলাম ?কি জানি আমার তো মনে নেই?"

"তুমি তো ভুলো তোমার কিছুই মনে থাকেনা কোনদিন আমাকেও ভুলে যাবে |"

অসম্ভব কিছুই নয় তবে সেটার চান্সটা কম কারণ আমাদের দুজনেরই জীবনে বাবা মা ভাই বোন আত্মীয়সজ্জ্বন বা মনে রাখার মতো আর কেউ নেই দুজনেই সমাজ পরিত্যক্ত এবং অনাথ |অতএব আমরা দুজন দুজনকে ভুলে গেলে মনে রাখার মতো আর কোনো বিষয়ই আমাদের থাকবে না |”

চুপ করো ইয়ার্কি মেরো না ,দেখছো একটা সিরিয়াস কথা বলছি সত্যি বলছি, বাঁচার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না সেদিন ,জানো আমার প্রেম সময়ের কাছে প্রত্যাখ্যাত বাস্তবতার নিরীখে অবহেলিত |বাঁচার কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না সেই মুহূর্তে এমন একজনকে বড় দরকার ছিল যার বুকে মুখ লুকিয়ে আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে পারবো যে আমায় শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরবে আমার ব্যাথাগুলো নিজের মতো করে বুঝবে |তোমাকে দেখে কেন জানিনা মনে হয়েছিল তুমি সেইরকমই একজন মানুষআমাকে বাঁচাবার জন্য তোমার আপ্রাণ চেষ্টা দেখে কোথাও একটা আশার আলো দেখতে পেয়েছিলাম  আমি বেঁচে যাবার পর তোমার মুখের ওই হাসিটা দেখে আমি  যেন নতুন করে জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছিলাম |মনে মনে ভেবেছিলাম আমি যাকে চাই তার চেয়ে  আমাকে যে চায় তাকেই  গুরুত্ব দেয়া ভালো |সেই সব খারাপ দিনগুলোর চেয়েও তোমার আকর্ষণ তখন আমার কাছে বেশি হয়ে উঠেছিল |আজকের তারিখে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি সেদিনের সিদ্ধান্তটা কতটা সঠিক ছিল |"

হুম আমার মুখে হাসি দেখেছিলে  ?হতে পারে , মন যা ভাবে মুখে তার প্রতিফলন দেখা যায় বটে |আসলে কি জানো আমরা না চাইলেও অনেক সময় ইচ্ছায় অনিচ্ছায় অনেক প্রিয় মানুষকেই আমাদের হারাতে হয় , তোমার কষ্টের সে সব দিনগুলো আমিও কোনোদিন ভুলবো না |তোমার মুখের সেই ফুটে ওঠা যন্ত্রণাগুলো আমায় ব্যাকুল করে তুলতো আমি কিন্তু খুব কষ্টও পেতাম জানো ?"

উরি বাবা  ,তাই নাকি তবে কে যে তোমায় ভুলো বলে |আচ্ছা আমার মুখ দেখে কি করে তুমি আমার মনের কথা বুঝতে ?"

হৃদয়ের গভীরে যাকে ঠাঁই দেয়া যায়, তাকে সব কথা মুখ ফুটে বলতে হয় না চুপ করে থাকলেও মনের কথা বোঝা যায় | "

"তার মানে আমি তোমার হৃদয়ে  আছি?"

ই সি জি করে কনফার্ম করবো "-দুজনে সমস্বরে হেসে ওঠে |

"তবে যাই বলো ,তোমার এই নতুন কাজের সময়টা বেশ ভালো আমরা একসঙ্গে অফিসে আসতে পারি একসঙ্গে ফিরতে পারি "

"তা বটে "

আচ্ছা অফিসে থেকে যে এতো বার কারণে, অকারণে আমায় ফোন করো তোমার মালিক  কিছু বলে না ?"

সে টের পায়  না কিন্তু অনেক্ষন তোমার খবর না পেলে আমার চিন্তা হয় |একটু  তোমার গলাটা শুনতে পেলে আমি নিশ্চিন্ত থাকি "

তোমার আমাকে ক্লান্তিকর বা একঘেয়ে লাগেনা ?"

তোমায় না দেখলে বা তোমার আওয়াজ না শুনলে আমি নিরাপত্বাহীনতায় ভুগি চোখে অন্ধকার দেখি নিজেকে খুব অসহায় লাগে |দিনশেষে  তোমাকে সারাদিনের জমা সব কথাগুলো না বলতে পারা পর্যন্ত আমার শান্তি হয় না |"

তুমি কি রাতদিন আমার কথাই  ভাবো ?"

তুমি ভাবো না ?"

ভাবার সুযোগ পাইনা তার আগেই তোমার  ফোন আসে বা তুমি এসে যাও |"

"আমার কথা তোমার দিনে কতবার মনে পড়ে ?"

মনে  করার সুযোগ পাইনা "

সেকি ! কেন  ?"

কারণ আমি তোমায় এক মুহূর্তের জন্যও ভুলি না তাই মনে করতে লাগে না |"

"এগুলো কি নিছকই অভ্যাস ?"

"উঁহু , তা বোধহয় নয় |একটা সময়ের পর থেকে আমিও তো তোমার জীবনে আমার অবস্থান খুঁজতে শুরু করেছি |আমি জানি বা বুঝি যে তুমি হয়তো আমি তোমায় ভালোবাসি কথাটা উচ্চারণ করো না ঠিকই , কিন্তু তোমার ওই ছোট ছোট   কথাগুলো , যেমন সাবধানে যেও ,ভালো থেকো ,নিজের খেয়াল রেখো খেয়েছো ঘুমিয়ে পর শরীর কেমন  আছে ইত্যাদি ইত্যাদির  মধ্যে সেই ভালোবাসা নামক উপাদানটা অনেকটাই মেশানো থাকে |তোমার যুক্তি অনুযায়ী  যদি অনুভূতিগুলো পর পর সাজানো যায় তবে আমরা  একে অন্যকে পছন্দ করি ,সারাক্ষন একে অন্যের কথা ভাবি একের  সুখ দুঃখ আনন্দ ব্যাথা বেদনা অন্যকে   আনন্দ দেয় কষ্ট  দেয় আমরা সব সময় একে অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা করি , শান্তিতে রাখার চেষ্টা করি একে অন্যকে নিজের চাওয়া পাওয়ার হিসেবের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ  বলে  প্রমান করেছি |  একে অন্যকে সুখী রাখার একটা নিরন্তর প্রচেষ্টা কাজ করে আমাদের দুজনের মধ্যে |একে অন্যের ভালো থাকার কামনা করেছি নিরন্তর |এককথায় একে অন্যের  ভালোতে বাস করি ,অর্থাৎ তোমার কথা অনুযায়ী আমরা  দুজনে দুজনকে  খুব ভালোবাসি |তাই নয়কি ?"   

"সবে তো পাঁচটা বছর কেটেছে ,আর পাঁচটা বছর গেলে তবে তোমার কথার জবাব পাওয়া যাবে |"

"পাঁচবছর পর কেন ?"

"ওই যে বললাম সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কমপক্ষে দশ বছর লাগবে ,কারণ  খুব তাড়াতাড়ি কাছে আসা মানুষজন খুব  তাড়াতাড়ি আলাদা হয়ে যায় |সময়ের বদল হতেও সময় লাগে কিন্তু মানুষের মন বদলাতে সময় লাগে না |রাতে দেখা সুখস্বপ্নগুলোও একমুহূর্তেই  বদলে যায় কিন্তু আরও পাঁচটা বছর কাটাতে পারলে এই আচরণগুলো  অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে |অভ্যস্থ জীবনের হেরফের হলে মানুষ কষ্ট পায় তাছাড়া ততদিনে স্মৃতির ভান্ডারেও অনেক ছোট বড় ঘটনা জমে যায় যা একটা নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনের অনেকটা জুড়ে থাকে তখন একে অন্যকে ছেড়ে দেবার কথা লোকে সাধারণত ভাবতে চায় না |লক্ষ্য  করে দেখবে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের মধ্যে প্রেম সব থেকে গভীর হয় এরা একে অন্যকে ছেড়ে যাবার কথা ভাবলেও দুঃখ পায় |  একসঙ্গে বহুবছর থাকতে থাকতে হয়তো আমাদেরও এরকম হবে ,আমরাও হয়তো তোমার এই প্রশ্নের উত্তরটা  খুঁজে পাবো |ভালোবাসা নামক অনুভুতিটা আমরাও  নতুন করে আমাদের অভিজ্ঞতার আলোয় আবিষ্কার করতে পারবো |দেখো খুব পরিষ্কার করে বলতে চাইলে বলতে হয় যে এইসব তুচ্ছ চাওয়া পাওয়া হিসেবে নিকেশের ভিড়ে আমি তোমায় হারাতে চাইছিনা |আমরা দুজন তো বেশ আছি জরুরি তো নয় যে সব সম্পর্ককেই কোনো সংজ্ঞায় ফেলতে হবে হিসেবনিকেশের বাঁধা গন্ডিতে আটকে ফেলতে হবে আমরা দুজন দুজনের সান্নিধ্যে ভালো পাই , তোমার সাথে মনের কথা বলে সুখ পাই শান্তি পাই এটাই তো সব থেকে বড় কথা আমরা একে অন্যের অসুম্পর্ণতা জানি  আর তা সত্বেও আমরা একে অন্যের প্রতি এতো আকর্ষণ অনুভব করি |আমি বাকি জীবনটুকু তোমার সাথে এই ভাবে কাটাতে চাই , শুধু তোমার দিকে তাকিয়ে ,তোমার সুখের জন্য   সারাটা  জীবন কাটিয়ে দিতে চাই |আর দিনশেষে যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ব তখন তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে চাই "

"আর আমি যদি তার আগেই তোমায় ছেড়ে চলে যাই ?"

আমি এখন তোমাকে যতটা   চাই তার চেয়ে যেশি  হয়তো চাইতে পারবনা  কোনোদিন |কিন্তু এই আবেগের গভীরতা বা প্রয়োজনীয়তা  কতটা তা একদিন তুমি নিশ্চয় বুঝবে |প্রিয় মানুষকে না হারানো পর্যন্ত তার দাম বোঝা যায় না  |, একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলোর সুখবা তাকে ছাড়া থাকার সময়কার কষ্টটুকু বোঝা যায় না তাই কখনো হয়তো আবারো তোমার মনে হতে পারে যে  এই মানুষটাকে ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয় , এই  মানুষটার মতো তোমায়  কেউ চায় না |যদি সত্যি এরকম তোমার মনে হয় কখনো ,তাহলে আমার স্থির বিশ্বাস যে তুমি আবার আমার কাছেই ফিরে আসবে আর যদি একান্তই ফিরে না আসোতবে তুমি ভালো আছো জানলেই আমি ভালো থাকবো |রবীন্দ্রনাথের   গানের  ভাষায় প্রার্থনা করবো তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও আমি যত দুখ পাই গো |"


পিনাকী বসু 



116 comments:

  1. অসাধারণ দাদাভাই

    ReplyDelete
  2. পড়তে পড়তে পুরোটাই পড়ে ফেললাম দারুন লাগলো...��

    ReplyDelete
  3. পড়তে পড়তে হারিয়ে যাওয়ার মতো লেখা.. ������

    ReplyDelete
  4. এমন করেই ভালোবাসা বেঁচে থাকুক সবার জীবনে। সংজ্ঞায় না হোক, অনুভূতিতে।

    ReplyDelete
  5. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  6. Dujon premik er kothopakathan er modhhe dube gechilam porte porte,golper sese kheal porlo dujon premik er valobasar songa gulo ei ekjon lekhok er kolomeri to srishti.. ei valobasar songa gulo ba hok anubhuti guloi,beche thakuk lekha teo r sotti karer manus er jiboneo.. ek line a bolle, bolte pari, golper vetor harie jete kar na valo lage,amaro khub valo laglo..

    ReplyDelete
  7. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
    সত্যি ঘটনা।
    অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

    ReplyDelete
  8. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
    সত্যি ঘটনা।
    অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমার নামে কে কমেন্ট পোস্ট করছেন?

      Delete
    2. আমার নামে কে কমেন্ট পোস্ট করছেন?

      Delete
  9. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  10. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
    সত্যি ঘটনা।
    অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
      সত্যি ঘটনা।
      অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

      Delete
  11. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
    সত্যি ঘটনা।
    অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

    ReplyDelete
  12. আমার নামে কে কমেন্ট পোস্ট করছেন

    ReplyDelete
  13. আমার নামে কে কমেন্ট পোস্ট করছেন

    ReplyDelete
  14. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
    সত্যি ঘটনা।
    অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

    ReplyDelete
  15. ভালোবাসার ছবি এমনটাই হওয়া উচিত।
    সত্যি ঘটনা।
    অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।

    ReplyDelete
  16. দূর্দান্ত সাজানো একটা কাব্য স্যার। শ্রদ্ধা আপনাকে

    ReplyDelete
  17. ভীষণ ভালো লাগলো দাদা। #রাজকুমার

    ReplyDelete
  18. লেখকের বহুল পরিশ্রম ও ভাবনার ফসল।এমন আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি তো রাখেই,এর স্বাতন্ত্র্য এবং মাধুর্য্য অতিরিক্ত পুরস্কার চেয়ে বসে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

      Delete
  19. Prothome bujhte ektu somoy laglo

    ReplyDelete
  20. Sahityer sondhane ke dhonyobad

    ReplyDelete
    Replies
    1. কৌশিক কে বলে দেব

      Delete
  21. Erokom ekta valo lekha porabar jonyo

    ReplyDelete
  22. বার বার বলতে ইচ্ছে করছে.... অসাধারণ!!!

    ReplyDelete
  23. 👏👌👌👌👌 মনোমুগ্ধকর!!

    ReplyDelete
  24. এই রকম অনেক লেখা আপনার কাছ থেকে আশা করি!

    ReplyDelete
  25. সত্যি! অনবদ্য!

    ReplyDelete
  26. কী ভালো লেখো তুমি!

    ReplyDelete
  27. নতুন লেখা আবার কবে পড়বো?

    ReplyDelete
  28. সম্পাদক মহাশয় সুযোগ দিলে

    ReplyDelete
  29. সম্পাদক মহাশয় সুযোগ দিলে

    ReplyDelete
  30. এ ছবি হৃদয়ে আঁকা থাকবে

    ReplyDelete
  31. তবে তাই হোক

    ReplyDelete
    Replies
    1. লেখার মধ্যে জীবন আছে,

      Delete
  32. দাদা! তুমি একটা ভালোবাসার সমুদ্র, আমরা সবাই সেখানে সাঁতার কাটবো,

    ReplyDelete
  33. "ভালোবাসা বিভিন্ন রকম অভিব্যক্তি দিয়ে এর অর্থ বোঝানো হয় ,যেমন ধরো ,পছন্দ ,স্নেহ ,শ্রদ্ধা ,আসক্তি , প্রণয় ইত্যাদি ইত্যাদি |" তোমার এই কথায় ভালোবাসার অর্থ যথার্থ!!!!🙏👏👏

    ReplyDelete

করোনা কালের হতভাগ্য শৈশব - বিশাখা ব্যানার্জী পতি

  মুক্তগদ্য  'মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম  মোরা ঝর্ণার মত  চঞ্চল , মোরা বিধাতার মত নির্ভয়  মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল ।' - কবি কাজী নজরুল ইস...